সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-১৯৯৮

খেয়া একটি মাসিক পত্রিকা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিশ্লেষণ খেয়ার মাধ্যমে তুলে ধরা হবে। এসব ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে খেয়া অবশ্যই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে না। গরিব জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হবে। যখন কোন সমাজ গরিব-ধনীতে বিভক্ত তখন নিরপেক্ষ বলতে কিছু নেই। এক পক্ষের জন্য যা ভাল অন্য পক্ষের জন্য তা খারাপ মনে হবে। আমাদের দেশের শতকরা নব্বই জন মানুষই গরিব। এই দেশে গরিবদের পক্ষ নেওয়াটাই নৈতিকভাবে সঠিক বলে খেয়া মনে করে। সেটাই প্রকৃত গণতন্ত্রের দাবি।

বন্যা

১৯৮৮ সালের বন্যা এবং এবারের বন্যা থেকে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট। বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কয়েক বছর পর পর আমাদের দেশ বন্যায় তলিয়ে যাবে। দেশের সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। মানুষ চরম দুঃখকষ্টের মধ্যে নিপতিত হবে। বন্যা আমাদের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞের মতে বন্যার পানি আসা বন্ধ করা যাবে না। বিশেযজ্ঞদের একথা মিথ্যা নয়। তবে বন্যা যাতে দেশের সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি করতে না পারে, মানুষকে পথের ভিখারীতে পরিণত করতে না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ অসম্ভব নয়। দেশের নদী-নালা খাল বিল বিলের সংস্কার করা হয়নি বলে বছরের পর বছর পলিমাটি পড়ে নদী-নালা খাল বিল ভরাট হয়ে গেছে। তাছাড়া কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়াই খাল বিল ও জলাশয়গুলি ভরাট করে দালান কোঠা ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করাতে বন্যার পানি দ্রুত সরতে পারে না। এভাবে নদীমাতৃক এই দেশের নদী-নালা ও খালবিলকে ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে বন্যার এই ভয়াবহ রূপ। বনজঙ্গল সাফ হয়ে যাওয়াতে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। আমাদের বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নদী-নালা, খালবিল খনন করা সম্ভব। প্রয়োজনে নদীর বাঁক ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব। আমাদের জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে দুটো পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণের মধ্যে এই উপলব্ধি সঞ্চার করতে হবে যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ থেকে তারাই লাভবান হয়নি। লাভবান হয়েছে দেশের ধনীরা ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। দ্বিতীয়তঃ বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে বিশাল সম্পদের প্রয়োজন। সেই সম্পদ কোথা থেকে আসবে? এখন পর্যন্ত প্রতিটি প্রকৃতিক দুযোের্গর সময় আমরা বিদেশ থেকে রিলিফ ও সাহায্য নিয়েছি। রিলিফ ও সাহায্য দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে সম্পদের প্রয়োজন সেই সম্পদ বিদেশ থেকে পাওয়া যাবে না। আমাদের উন্নতি বিদেশী দাতাদের কাম্য নয়। আমরা গরিব থাকলে, রিলিফ ও ভিক্ষার উপর নির্ভরশীল থাকলেই তাদের সুবিধা। অতএব, আমাদের নিজস্ব উৎস থেকেই বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্পদ যোগাড় করতে হবে। এটা করা অসম্ভব নয়, তবে এজন্য অসাধারণ পদক্ষেপ নিতে হবে। বলাযায় বিপ্লবী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশের ও দেশের জনগণের স্বার্থে এধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ অস্বাভাবিক নয়। অতএব, মানুষের মধ্যে যখন এই উপলব্ধি সঞ্চারিত হবে যে জনগণের স্বার্থেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং অন্য সবকিছুই হচ্ছে তখন কোটি কোটি মানুষকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার কাজে লাগানো সম্ভব হবে। দ্বিতীয়তঃ বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ যখন নিজস্ব উৎস থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব হবে তখন পরমুখাপেক্ষী হয়ে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার প্রয়োজন হবে না।

প্রধানমন্ত্রী বন্যার কবল থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ্‌র রহমত চেয়ে সউদি আরবে গিয়ে মুনাজাত করেছেন। সংসদের প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী বন্যাকে আল্লাহ্‌র গজব বলে অভিহিত করেছেন। এসব কথাবার্তা বলে মানুষকে বোকা বানানো যায়। কিন্তু, বন্যার ভয়াবহতা বন্ধ করা যাবে না। বন্যার ভয়াবহতা বন্ধ করতে হলে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। হল্যান্ডের কথা কে না জানে। একসময় হল্যান্ড সমুদ্রের নীচে ছিল। হল্যান্ডের অধিবাসী যাদের ডাচ্‌ বলা হয় তারা ডাইক বা বাঁধ নির্মাণ করে সমুদ্রের তলদেশ থেকে জমি উদ্ধার করে হল্যান্ড সৃষ্টি করেছে। হল্যান্ড গড়ে উঠেছে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত গরু ও দুধের খামার, উন্নত কৃষি খামার, আধুনিকতম নগর ও বিমানবন্দর। তাই ইউরোপের মানুষ বলে পৃথিবী সৃষ্টি করেছে আল্লাহ আর হল্যান্ড সৃষ্টি করেছে ডাচ্‌রা। এবার চীনের উপর দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বন্যা হয়ে গেল। অতীতে চীন ছিল ভয়াবহ বন্যা কবলিত এক দেশ। চীনের একটি নদীর নাম ছিল চীনের দুঃখ। চীনের জনগণ বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য চীনের জনগণ ৭ বছর ধরে এত মাটি খুঁড়েছিল যে সেই মাটি দিয়ে তিন ফুট চওড়া ও তিন ফুট উঁচু বাঁধ তৈরি করে পৃথিবীকে ৩৭ বার বেষ্টনী দেওয়া সম্ভব হতো। এই রিপোর্ট লন্ডনের প্রখ্যাত টাইম পত্রিকার। হল্যান্ড ও চীনের জনগণ যা করতে সক্ষম হয়েছে তা আমাদের জনগণের পক্ষেও করা সম্ভব। আমাদের জনগণ ইতিমধ্যে তার প্রমাণ দিয়েছে। এবারের বন্যার সময় আমাদের দেশের জনগণ যখন দেখেছে বন্যার পানিতে বাঁধ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে তখন তারা সমস্ত শক্তি দিয়ে বাঁধ রক্ষা করেছে। নিজেদের চাহিদা থেকেই মানুষ দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। অতএব, যখন মানুষ দেখবে তারা যা করছে সেটা নিজেদের অবস্থার উন্নতির জন্যই তখন মানুষও অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে সক্ষম হবে।

রাজনীতি নিষিদ্ধ:

রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মুখ থেকে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়। মানুষের দুঃখকষ্ট নিয়ে রাজনীতি না করার কথা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেত্রী নেতাদের দিক থেকে এধরণের আহবান খুবই শোনা যায়। রাজনৈতিক দলের নেত্রীনেতাদের মুখ থেকে এধরণের আহবানের তাৎপর্য মানুষ বোঝে না। তারা এমন সব বিষয় নিয়ে রাজনীতি করতে বারণ করেন যা নিয়ে বেশি করে রাজনীতি করাই সঠিক। যেমন, রুবেল হত্যার মত মর্মস্পর্শী ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ পুলিশের হেফাজতে রুবেল হত্যার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে একটা রাজনৈতিক বিষয়। তাই রুবেল হত্যার ঘটনা সমগ্র জাতিরও রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনাকে একটা আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করা হলে মারাত্মক ভুল হবে। এটা যদি একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতো তাহলে সমগ্র জাতির বিবেককে এই ঘটনা এমনভাবে নাড়া দিত না। এখানকার বিবেকবান ও সচেতন মানুষের একটাই প্রার্থনা। জনগণ যেন এই ঘটনা অন্যান্য ঘটনার মত ভুলে না যায়। এই মর্মািন্তক ঘটনা আর যাতে না ঘটে সেজন্য মানুষ যেন তাদের ক্ষোভ প্রকাশ ও আন্দোলন অব্যাহত রাখে। রুবেল হত্যাকান্ডের মত দুঃখজনক ঘটনা এদেশে ঘটার কারণ বর্তমান রাজনীতি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছ থেকে মানবিক আচরণ আশা করা যায় না। প্রচলিত রাজনীতির পরিবর্তন না ঘটলে এধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। রুবেল হত্যার পর জেলখানায় এক কিশোর হাজতীর(আলমগীর) মৃত্যু তার প্রমাণ। আমাদের দেশে পুলিশ হেফাজতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্যাতন করার অথবা নির্যাতনের পরিণতিতে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। এদেশে এই নির্যাতন ও মৃত্যুকে এতদিন স্বাভাবিক বলেই মনে করা হয়েছে। রুবেলের বাবা পুত্রের হত্যার বিচার দাবি করেছেন। হত্যাকারীর ফাঁসি দাবি করেছেন। কিন্তু, অনেক পিতা বা মাতা পুলিশ হেফাজতে পুত্রের হত্যার বিচার দাবি করেনি। তারা নীরবে মেনে নিয়েছে। অতীতে মানুষের মধ্যেও সেই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি যে প্রতিক্রিয়া রুবেলকে নিয়ে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ ওইসব হত্যাকান্ডকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছে। অথচ পুলিশ র্কতৃক নির্যাতন ও হত্যা বেআইনী। রুবেল হত্যার পর সাধারণ মানুষের দিক থেকে দাবি উঠেছে এধরণের হত্যাকান্ড ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। সেটা রাজনীতি দিয়েই করা সম্ভব। যে রাজনীতি পুলিশ হেফাজতে মানুষ হত্যা বন্ধ করবে সেই রাজনীতি কি হবে সেটা জানার আগে একটা কথা বলা দরকার।

এই ধরণের ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেত্রী-নেতারা ছলচাতুরী বা চালাকির আশ্রয় নেয়। এরকম ছলচাতুরী ও চালাকিকেই এদেশের মানুষ ''পলিটিকস'' বলে মনে করে। ক্ষমতাসীনরা রুবেল হত্যার দায়দায়িত্ব এড়াবার জন্য এমনি ছলচাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ''রুবেল হত্যার সংশ্লিষ্ট ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার মধ্যে একজন পুলিশ বিএনপির আমলে চাকরি পায়। আর একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিন চৌধুরীর দেহরক্ষী ছিলেন। ঘটনা কোথা দিয়ে কিভাবে ঘটল এসব ভেবে দেখতে হবে।'' প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য থেকে মনে হয়েছে ছয়জনের মধ্যে একজনের বিএনপি সরকারের আমলে চাকরিতে নিয়োগ এবং অন্যজনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেহরক্ষী থাকার সাথে রুবেল হত্যার একটা সম্পর্ক বা যোগসূত্র হবে'' এ ধরণের কথাবার্তা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। সস্তা রহস্য সৃষ্টির প্রয়াস। পুলিশ সব সরকারের আমলেই নিয়োগ হতে পারে। সব সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দেহরক্ষী হিসাবে ডিউটী করতে পারে। এটা কোন বিষয় হতে পারে না। এসব কথার উদ্দেশ্য কি সরকারের দায়িত্ব চাপা দেওয়া নয়? যে রাজনীতি এই নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী তাকে আড়াল করা নয়? অথচ, রুবেল হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের উদ্দেশ্য উপরোক্ত বিষয় দুটি (সরকারের দায়িত্ব ও রাজনৈতিক দিক) নিয়ে বিশদ আলোচনা ও বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে দিনাজপুরের ইয়াসমিন হত্যা নিয়ে তিনি রাজনীতি করেননি। তিনি একজন রাজনীতিবিদ হয়েও ইয়াসমিন হত্যার রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা না করে ভুল করেছেন। অথচ, তিনি এটাকেই সঠিক কাজ এবং অনুকরণ করার মত ভাল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন। তিনি যদি ইয়াসমিন হত্যার রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করতেন ও বিতর্ক সৃষ্টি করতেন তাহলে দেশের জনগণ জানতে পারত কোন পরিস্থিতিতে দেশের পুলিশ র্কতৃক এক অসহায় দরিদ্র কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করা সম্ভব। তাঁর ভোটের অধিকারের আন্দোলন ও দুইশ দিনের হরতালের চেয়ে ইয়াসমিন হত্যা নিয়ে আন্দোলন থেকে গরিবেরা উপকৃত হতো। আসলে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে রাজনীতির অর্থ নোংরামি ও কাদা ছোঁড়াছূঁড়ি। তাই তিনি ইয়াসমিন হত্যা নিয়ে রাজনীতি না করাকে একটা মহৎ দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন। অথচ, পুলিশ হেফাজতে রুবেল, ইয়াসমিন, সীমা এবং আরো অনেকের মৃত্যুর মত ঘটনা যদি বন্ধ করতে হয় তাহলে যে রাজনীতি এধরণের মৃত্যুর জন্য দায়ী তার চরিত্র বুঝতে হবে এবং দেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। তাছাড়া পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু বন্ধ হবে না।

পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করার জন্য আইন যথেষ্ট নয়। যারা ক্ষমতার অধিকারী তারা আইনের ধার ধারে না। তারা আইনের উধ্র্বে। এখানকার রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করে। ক্ষমতাসীনদের সাত ক্ষুন মাপ। তারা যা ইচ্ছা তা করতে পারে। কোন অপরাধের জন্যই তাদের জবাবদিহি করার দরকার নেই। প্রায় সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারীদের রক্ষা করে। তাদের হুকুমেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি চলে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলির কাজ হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারীদের সেবা করা ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের হুকুম তামিল করা। অতএব, পুলিশ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরের লোকজনকে মানুষ বলে গণ্য করে না। তাই আমরা লক্ষ্য করেছি পুলিশ যখন তখন বিরোধী দলের লোকজনকে গ্রেফতার, নির্যাতন বা হত্যা করতে ভয় পায় না। কিন্তু, সরকারী দলের লোকজনের বেআইনী কাজ দেখেও দেখে না। উপরতলার নির্দেশ ছাড়া সরকারী দলের লোকদের পুলিশ সচরাচর গ্রেফতার করে না। এদেশের গরিব জনগণ রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে আরও দূরে। ক্ষমতাধররা, গরিব-দুঃখীদের মানুষ বলে গণ্য করে না। বিপরীত কথাটাও সত্য। বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক ক্ষমতার অতি কাছাকাছি অবস্থান করে। কারণ রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের প্রচুর টাকার দরকার। ক্ষমতাসীনদের আরও বেশি দরকার। ফলে টাকার অধিকারীরা রাজনৈতিক ক্ষমতারও অধিকারী। এমনকি বিরোধী দলের ধনীদেরও সরকারী দলের সাথে ভাল সম্পর্ক।

অতএব, পুলিশ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের লোকজন যখন মনে করে তারা সরকারকে খুশি করতে সক্ষম হয়েছে তখন তাদের আর ভয়ডর থাকেনা। এদেশে জনগণের কোন ভোটেই দলগুলি ক্ষমতায় যায়। কিন্তু, ক্ষমতার অধিকারীদের উপর জনগণের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই এখানকার সরকার, সরকারী দল এবং প্রশাসন একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারী। একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারীরা সবসময়ই স্বেচ্ছাচারী। এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ অসহায়। কারণ, এদেশের জনগণ অসংগঠিত ও অসচেতন। জনগণের নিজস্ব সংগঠন বলতে কিছুই নেই। অধিকাংশ ''গনসংগঠন'' কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ধামাধরা। ''অঙ্গ সংগঠন''। এসব ''গণ-সংগঠনের'' বেশিরভাগ নেতা রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থেকে প্রচুর সুযোগ-সুবিধা ও ধন-সম্পদের অধিকারী হয়। এই ধরণের গণ-সংগঠনগুলি ক্ষমতাসীন দলের স্বেচ্ছাচারিতাকে সমর্থন করে ও মদদ জোগায়। ক্ষমতাসীন দল ও গণসংগঠনের নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতাকে মদদ জোগায়। এই পরিবেশে জনসাধারণের প্রতি পুলিশের মানবিক ব্যবহার আশা করা যায় না। যেদিন পুলিশ দেখবে রাজনৈতিক ক্ষমতার লক্ষ্য হলো জনকল্যাণ এবং কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক ক্ষমতার বদৌলতে ধন-সম্পদের অধিকারী হতে পারে না এবং গণসংগঠনগুলি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অর্জন করেছে সেদিন পুলিশের হেফাজতে রুবেল, ইয়াসমিন বা সীমারা নির্যািতত হবেনা।

বিলম্বিত উপলব্ধি:

বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন, তারাই খুনী, তারাই আবার কার বিচার করবে? তিনি আরও বলেন, সিরাজ সিকদারসহ সকল হত্যাকান্ডের বিচার হতে হবে। খালেদা জিয়ার একথা শুনে যে প্রশ্নটা দেখা দেয় সেটা হলো তিনি এখন কেন একথা বলছেন? সিরাজ সিকদারকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে। শেখ মুজিবের শাসনামলে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসে সিরাজ সিকদারের হত্যার বিচারের কথা বেদনাদায়ক তামাসাই। শেখ মুজিবের নির্দেেশই পুলিশ হেফাজতে সিরাজ সিকদারকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। হত্যার পর সংসদে শেখ মুজিব দম্ভভরে ঘোষণা দেন, কোথায় সিরাজ সিকদার। শেখ মুজিবের নির্দেশ ছাড়া সিরাজ সিকদারকে হত্যা করা সম্ভব ছিল না। কিছুদিন আগে এক সময়ের বিপ্লবী ছাত্রনেতা মাহবুব-উল্লাহ উল্লেখ করেন যে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের আগষ্ট পর্যন্ত ২৭ হাজার বিপ্লবী তরুণ ও বিরোধী দলের লোকজনকে হত্যা করা হয়। একজন সচিব বিবেকের বোঝা লাঘব করার জন্য তাঁকে এই তথ্য দেন। সচিব দেশ ত্যাগ করে চলে যান। আরও অনেকের মুখেই শোনা গেছে শেখ মুজিবের শাসনামলে ২৫ হাজার বামপন্থী কর্মীেক হত্যা করার কথা। কিন্তু, ১৯৭৫ সালে বাকশালের পতনের পর যে সরকারগুলি ক্ষমতায় এসেছে তার মধ্যে বিএনপি অন্যতম। তখনকার অনেক বামপন্থী নেতা ও কর্মী বিএনপিতে যোগদান করে। কিন্তু, বিএনপি সরকার ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যেসব রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নিখোঁজ বা নিহত হয়েছে তাদের বিষয় নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেনি। বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশও দেয়নি। ফলে ১৯৭৫ সালের পরে যাদের জন্ম তারা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এদেশে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালু ছিল সে সম্পর্কে কিছুই জানে না। তারা এমনকি সে সময়ের(১৯৭৫ সালের) ব্যাপক জনগণও ভাল করে জানত না যাদের হত্যা ও গুম করা হয়েছিল তারা কি চেয়েছিল এবং কেন তাদের হত্যা ও গুম করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের পরের সরকারগুলি এদেশের ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায় সম্পর্কে জনগণকে অজ্ঞ রেখেছে। ১৯৭৫ সালের পরের সরকারগুলি শেখ মুজিব ও তাঁর সরকারের প্রতি ভালবাসার কারণে জনগণকে ১৯৭২-৭৫ সালের ঘটনাবলী সম্পর্কে অজ্ঞ রাখেনি। শেখ মুজিব ও তাঁর সরকার সিরাজ সিকদারসহ হাজার হাজার বিপ্লবী তরুণকে হত্যা করে যে অপরাধ করেছিল সেই অপরাধের প্রতি ১৯৭৫ সালের পরের সরকারগুলির একটা মৌন সম্মতি ছিল। তাই তারা ১৯৭২-৭৫ সালে সংঘটিত হত্যাকান্ড সম্পর্কে নীরব থেকেছে। সিরাজ সিকদারের গ্রেফতার এবং পুলিশের হেফাজতে তাঁর মৃত্যুর খবর তখনকার সব দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হওয়া সত্ত্বে সেই ঘটনার একটা বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ পর্যন্ত পরবর্তী সরকারগুলি দেয়নি। তার কারণ, যে হাজার হাজার তরুণকে শেখ মুজিব ও তাঁর সরকার হত্যা করেছিল সেসব তরুণেরা যে আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যজীবন দিয়েছে, নির্যাতন ভোগ করেছে ও জেল খেটেছে শেখ মুজিবের পরের সরকারগুলিও সেই আদর্শের বিরোধী ছিল। ওইসব তরুণেরা বিশ্বাস করেছিল যে সকল বৈষম্যের অবসানই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও লক্ষ্য। এই চেতনা ও লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে ও জীবন দিয়েছে। অথচ, বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর হওয়ার পরিবর্তে আরও তীব্র হয়েছে। ১৯৭৪ সালে এদেশে হাজার হাজার মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যায়। সেটা নিঃসন্দেহে একটা বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু, তার চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল যখন মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছিল তখন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সরকারের অন্যান্য হোমড়া চোমড়া ব্যক্তি এবং দেশের ধনীরা আরাম আয়েশ ও বিলাসিতার মধ্যে জীবন যাপন করেছে। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা ছিল একটা প্রতারণা। অতএব, দেশের দেশপ্রেমিক তরুণদেও মনে হয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার স্বাধীনতার লক্ষ্য ও চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষে মানুষে বৈষম্যকে তারা অন্যায় বলে মনে করেছে। এই বৈষম্য টিকিয়ে রেখে শেখ মুজিব ও তাঁর সরকার স্বাধীনতাকে প্রহসনে পরিণত করেছে। এই অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য তারা সংগ্রাম শুরু করে। সেইসব তরুণ দেশপ্রেমিক তাদের মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংগ্রামের যে পথ বেছে নেয় সেটা ভুল ছিল। তারা জনগণকে যথেষ্ট পরিমাণে সচেতন ও প্রস্তুত না করেই সংগ্রামে লিপ্ত হয়। শেখ মুজিব ও তাঁর সরকার সেই তরুণদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পথ বেছে নেন। আজকের আওয়ামী লীগের নেত্রীনেতারা হত্যার রাজনীতি চালু করার জন্য ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সরকারগুলিকে দায়ী করে। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিব ও তাঁর সরকারই এদেশে হত্যার রাজনীতি চালু করে। সেই হত্যার রাজনীতিরই শিকার সিরাজ সিকদার।