কেন রাজনৈতিক হানাহানি?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুইটা অঙ্গীকার করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন তিনি যদি ৬ মাসের মধ্যে সন্ত্রাস দমন এবং রাস্তাঘাট দুর্ঘটনামুক্ত করতে না পারেন তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কবে একথা বলেছিলেন সেটা মনে নেই। এদেশে এসব কথা কেউ মনে করে বসে থাকে না। মানুষ মন্ত্রী বা রাজনীতির লোকদের কথার খুব একটা দাম দেয় বলে মনে হয় না। মানুষ জানে এদেশে কোন কিছু হয় না। সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। অন্তত পরিস্থিতির উন্নতি কেউ আশা করে না। তার লক্ষণ দেখা যায় না। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৬ মাস কখনও শেষ হবে বলে মানুষ মনে করে না। মানুষ এ বিষয় নিয়ে চিন্তাও করে না। সময় দাঁড়িয়েই থাকবে। নতুন বর্ষ শুরু হয়েছে। গত বছরের শেষ কয়েক দিনের ঘটনা যদি ভবিষ্যতের কোন ইঙ্গিত হয় তাহলে সেটাকে শুভ ইঙ্গিত বলা যাবে না। ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার বালুভর্তি এক ট্রাক রাস্তার পাশে পড়ে গেলে ১৫ জন 'যাত্রী' মৃত্যুবরণ করেছে। ট্রাকে 'যাত্রী' থাকার কথা নয়। ট্রাক মালামাল বহন করবে। যাত্রী বহন করবে না। যাত্রী বহন করা খুবই বিপদজনক। অথচ মহাসড়কে অহরহ ট্রাক যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করছে। রাস্তা দুর্ঘটনামুক্ত করতে হলে আরও অনেক কিছুর সাথে ট্রাকে যাত্রী বহন বন্ধ করতে হবে। সেটা করা হচ্ছে না। অবশ্য রাস্তা দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য এটা বড় বিষয় নয়। আসল বিষয় ভিন্ন। আর সন্ত্রাস দমন আরও বড় সমস্যা। সরষের ভিতরেই যে ভূত সেটা কয়েকটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট। টাঙ্গাইলে শাসকদের মধ্যে কোন্দল ভয়ববহ আকার নিয়েছে। বোমাবাজি, গোলাগুলি, গুম, খুন ও হানাহানির ভয়ে শহরবাসী আতঙ্কগ্রস্ত। সন্ত্রাস দমন করার জন্য পুলিশ বিডিআর নিয়োগ করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পরিবর্তে জটিল আকার নিয়েছে। পুলিশী অভিযানের প্রতিবাদে শাসক দলের এক সংসদ সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতির পুলিশী অভিযান দিয়ে কতদূর কি করা সম্ভব? অন্য আরও একটা খবর জনগণের বিবেককে মারাত্মক আঘাত করেছে। পিতামাতার সামনে দুই মেয়েকে বিবস্ত্র করে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এই ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম নগরীতে। এক্ষেত্রেও যারা জড়িত তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার খুব কাছের মানুষ। ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৯৬ ঢাকার মীরপুরে শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে একজন ছাত্রনেতা নিহত হয়। এস ব ঘটনা প্রমাণ করে বর্তমান সরকার অতীতের সরকারের মতই সন্ত্রাস দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে। অতীতের সরকার আর বর্তমান সরকারের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তাই বিএনপি সরকারের পাঁচ বছর আলাদা হবে না। আলাদা হওয়ার কোন কারণও নেই।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ অথবা সন্ত্রাস দমন কোনদিন সম্ভব হবে না যদি বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকে। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট হলো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় সম্পদ লুটপাট করা। এ জন্য সরকারী ক্ষমতা দখল করাটাই উত্তম পথ। জাতীয় সম্পদের লুটপাটকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক হানাহানি ও সন্ত্রাস। যতদিন রাজনৈতিক ও সরকারী ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা ধন-সম্পদেরও অধিকারী হতে পারবে ততদিন রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে দুর্নীিত হানাহানি ও সন্ত্রাস জড়াজড়ি করে থাকবে। এটা পৃথিবীর সব দেশের ক্ষেত্রেই সত্য। তবে ইউরোপ আমেরিকার ধনী দেশগুলিতে এটা কোন সমস্যা সৃস্টি করে না। সেসব দেশে দুর্নীিত হলেও ধন-সম্পদের দখল নিয়ে মারামারি হানাহানি হয় না।এটা গরিব দেশের বৈশিষ্ট্য। ঠিক যেমন দরিদ্র পরিবারে বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে মারামারি বা কলহ লেগেই থাকে। ধনী দেশগুলি গোটা পৃথিবীর সম্পদ লুটপাট করে নিজেদের দেশে এত ধন-সম্পদ জড়ো করেছে যে সম্পদ ভাগভাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি হানাহানি করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তুু, আমাদের দেশে সেই ধরণের সম্পদ নেই, যা সবাইকে মোটামুটি সন্তুুষ্ট রাখতে পারে। ফলে এদেশে সম্পদের অধিকারী হওয়ার জন্য একজন আর একজন, একদল অঅর এক দল অথবা এক শ্রেণী অঅর এক শ্রেলীর বিরুদ্ধে হানাহানিতে লিপ্ত হয়। যেমন, এক সময় উন্নত দেশগুলি-আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইটালী, জার্মানী, জাপান ইত্যাদি-এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলি থেকে সম্পদ লুটপাট করতে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করত। এখন আর তার দরকার হয় না। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি নতুন ও কার্যকর পদ্ধতি অবলম্বন করে অনুন্নত দেশগুলির সম্পদ লুট করে।
আমাদের দেশে সম্পদের বাটোয়ারা নিয়ে হানাহানি ও খুনোখুনি বন্ধ করতে হলে দুটো পথ খোলা আছে। আমাদেরও উন্নত দেশগুলির মত প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হতে হবে। অথবা, রাজনৈতিক দলগুলির নেতানেত্রীদের বিশাল সম্পদের অধিকারী হওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে। আমাদের জন্য প্রথম পথটা আপাতত বন্ধ। অতএব, রাজনৈতিক হানাহানি মারামারি সন্ত্রাস বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক ও সরকারী ক্ষমতার অধিকারীদের ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়াটাই নিষিদ্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে সব রাজনৈতিক দল এবং দলের নেতানেত্রীদের কসম খেয়ে বলবে যে তাদের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়া নয়। জনগণ বিশেষ করে গরিব জনগণকে সেবা করাই রাজনৈতিক দল ও দলের নেতানেত্রীদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তাহলে ত আর কথাই নেই। জনধরদী রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীদের জন্য ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়া নিষিদ্ধ করাটা কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বরং এটাই অবাক ব্যাপার যে কেন এযাবৎ কোন দল ক্ষমতায় গিয়ে এধরণের অঅইন করেনি যে রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের ধন-সম্পদের অধিকারী হতে পারবে না। এথেকে মনে হয় তাদের উদ্দেশ্য খুব সৎ নয়। সৎ ব্যক্তিদের কথা ও কাজের মিল থাকে। জনদরদীই যদি হবে তাহলে বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়ার কি প্রয়োজন। তাও আবার ক্ষমতার জোরে দুর্নীিতর-আশ্রয় নিয়ে ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়া। অতএব, যতদিন রাজনৈতিক ও সরকারী ক্ষমতার অধিকারীর ধন-সম্পদের অধিকারী হতে পারবে ততদিন লাজনৈতিক হানাহানি বা সন্ত্রাস বন্ধ হবে না।
বিপথগামী যুবক:
সরকার জেলাখানায় বন্দীদের মধ্যে থেকে ১০ হাজার কয়েদী ও হাজতীদের সাধারণ ক্ষমতার আওতায় মুক্তি দেবে বলে খবরে প্রকাশ। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে এইসব বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হবে। কারাগারের ধারণ ক্ষমতাজনিত সমস্যাত আছেই। ধারণ ক্ষমতার তিন গুণ বেশি বন্দী দেশের কারাগারগুলিতে আটক রয়েছে। বন্দীরা যে কি অবস্থায় জীবন যাপন করছে সেটা যারা জেলখানায় কখনও বাস করেনি তারাও অনুমান করতে পারবে। আর যারা ভুক্তভোগী তারা ত হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছে।
তাছাড়া, উপচে পড়া কারাগারগুলির প্রশাসনের দায়িত্বে যারা আছে তাদের এটা একটা সমস্যা। অতএব, বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার এটাও একটা কারণ। আরও কারণ আছে। বিনা বিচারে দীর্ঘিদন আটক, সামান্য অপরাধের জন্য দীর্ঘিদন কারাভোগ ইত্যাদি। আরও একটা কারণ খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। সেটা হলো যেসব যুবক স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায় সরকার তাদের সাধারণ ক্ষমতার আওতায় মুক্তি দেবে। এই খবর শুনেমনে হয়, 'বিপথগামী' যুবকদের বেছে নেওয়ার বা পছন্দের একটা ব্যাপার আছে। যারা বিপথগামী হয়েছে তারা ইচ্ছা করলেই বুঝি স্বাভাবিক জীবন বেছে নিতে পারে। কিন্তুু বেছে নেয়নি। সরকার যদি সত্যি এরকম মনে করে থাকে তাহলে এটা বলতেই হয় যে দেশের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সরকারের ধারণা নেই। এদেশে স্বাভাবিক জীবনই ব্যতিক্রম। স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি থাকলে কেউ অস্বাভাবিক পথে পা বাড়ায় না। বিপথগামী হয় না। এদেশের যেসব কিশোর কিশোরী বা যুবক যুবতী যে বিপথগামী হচ্ছে তাদের সামনে স্বাভাবিক জীবনের পথটা বন্ধ বলেই তারা বিপথে পা বাড়িয়েছে। যারা অপরাধী তাদের শাস্তি দিতে হয়। জেলেও বন্দী করতে হয়। তাছাড়া উপায় নেই। এটা কিন্তুু অস্বীকার করা যাবে না যে আজকে দেশের অসংখ্য কিশোর কিশোরী ও যুবক যুবতী যে বিপথগামী হয়েছে তার জন্য বিপথগামীরা দায়ী নয়। দায়ী এখানকার অর্থৈনতিক ও সমাজ ব্যবস্থা। তীব্র বেকার সমস্যা এবং দারিদ্র থেকে হতাশা এজন্য দায়ী। তাছাড়া আরও কারণ আছে। এদেশে অন্যায়ের প্রতিকার হয় না। বিশেষ করে যারা দরিদ্র অথবা রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন তারা অন্যায়ের প্রতিকার হতে দেখে না। এরকম অবস্থায় যদি কোন যুবক বিপথগামী হয় তার জন্য সমাজ দায়ী। এইসব যুবক যুবতী ও কিশোর কিশোরীই বিপথগামী হলে জেলে যায়। যারা বিশাল ধনসম্পদের অধিকারী অথবা রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে বাস করে তাদের জন্য সাত খুন মাপ। যুবক-যুবতীদের হতাশার জন্য এটাও কম দায়ী নয়। চোখের সামনের কিছু মানুষ অবৈধ পথে বিশাল ধন-সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হচ্ছে। (এদেশে যারা বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছে তারা সবাই বৈধ পথেই হয়েছে এটা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না।) এটা দেখার পর দেশের তরুণরা যদি বিপথগামী হয় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অতএব, এটাই সত্য যে আমাদের তরুণরা ইচ্ছা করে অস্বাভাবিক জীবন বেছে নেয় না। সমাজ তাদের বাধ্য করে। এই অবস্থায় যেটা দরকার সেটা হলো আমাদের তরুণদের বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করা। সরকার থেকে বলা হয়েছে যেসব তরুণরা স্বাভাবিক পথে ফিরে আসতে চায় সরকার তাদের সাধারণ ক্ষমতার আওতায় মুক্তি দেবে। আমাদের বিশ্বাস দুই একজন ছাড়া দেশের সব তরুণ-তরুণরাই স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবন চায়। অস্বাভাবিক ও অসুস্থ জীবন অন্তত আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের কাম্য নয়। স্বাভাবিক জীবনের পথ খোলা থাকলে জেলাখানাগুলি খালি হয়ে যাবে। আমাদের জাতির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দেশের তরুণ তরুণীদের জন্য স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনের ব্যবস্থা না করে তাদের বিপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সবার জন্য স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব প্রথমত সরকারের। তারপর উঁচুতলার মানুষের। এদেশে উঁচুতলার মানুষগুলি স্বার্থপর। সরকারগুলি তাদের স্বার্থেকই দেখেছে। উঁচুতলার মানুষের জীবন যাত্রা কলুষিত বলে আমাদের সমাজও কলুষিত হয়ে পড়েছে। বলা হয় শহরে বস্তিগুলি অপরাধের উৎস। শহরে বস্তি গড়ে উঠল কেন সেই প্রশ্ন কেউ করে না। মানুষ কেন স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে ফেনসিডিল, হেরোইন বা দেহ ব্যবসা করে, সেই আলোচনা হয় না। অতএব, জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিপথগামী তরুণরা যদি পুনরায় অপরাধের পথে পা বাড়ায় অথবা যাদের মুক্তি দেওয়া হলো তাদের স্থান অন্যরা পূরণ করে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাই হবে। এই অবস্থায় জেলখানার অধিবাসীর সংখ্যা কমবে না।
রিকশাচালক ও রিকশামালিকদের আশা ভঙ্গ:
আমাদের সমাজের সমস্যা হলো একই সাথে সবার ভাল করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে জাতির ভাল বলতে সবার ভাল বুঝায় না। এর কারণ স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব। যাতে ব্যাপক জনগণের ভাল তাতে এক শ্রেণীর মানুষের খারাপ। আবার এই শ্রেণীর মানুষের যাতে খারাপ ব্যাপক জনগণের তাতে ভাল। শীতের রাতের খাটো কম্বলের মতই ব্যাপার। মাথা ঢাকেত পা ঢাকে না, পা ঢাকেত মাথা ঢাকে না। এই সমস্যা সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়। সরকার ঢাকা ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কোন কোন রাস্তা দিয়ে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। শহরে চলাচলকারী রিকশার সংখ্যাও কমাতে চাচ্ছে। এই অবস্থায় নতুন নাম্বার দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। সরকারের এই সিদ্ধান্ত যে গরিব মানুষের স্বার্থে নয় সেটা পরিস্কার। এ দেশে গরিব মানুষের কাজ পাওয়া খুবই মুস্কিল। গরিবদেও পক্ষে ব্যবস্থা করাও সম্ভব নয়। তাদের পুঁজি নেই। পুঁজি থাকলেও সেটা এতই ক্ষুদ্র যে তার অস্তিত্ব সহজেই শেষ হয়ে যায়। এত ছোট পুঁজি কোন পুঁজি নয়। তাই শ্রমই গরিবদের একমাত্র ভরসা। কিন্তুু কাজ না থাকলে শ্রমেরও দাম নেই। এই অবস্থায় এদেশের গরিবদের জন্য একটা কাজই আছে। রিকশা চালানো। বিশেষ করে গ্রাম থেকে যারা কাজের জন্য শহরে আসে তারা রিকশাই চালায়। এতএব, রিকশার উপর আঘাত মানে গরিবদের পেটে লাথি মারা। সরকার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য গরিবদের পেটে লাতি মারার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া আর কি বলা যায়? গরিবদের জন্য বিকল্প কাজের ব্যবস্থা না করে রিকশা তুলে দেওয়া হলে অথবা রিকশার সংখ্যা হ্রাস করা হলে গরিবদের ভুখাই থাকতে হবে। অথবা চুরি করতে হবে। গরিবদের বসে খাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ধনীদের ছেলেমেয়েরা বেকার থাকলেও কোন অসুবিধা নেই। ধনীর বেকার ছেলে প্রাইভেট-কার চালায়, হোটেল ক্লাবে খানাপিনা ও রাতভর নাচগান করে। শুধু ফুর্তি আর ফুর্তি। ফর্তিও টাকা অবশ্য গরিবেরাই যোগায়। এই খবর গরিবেরা রাখে না। গরিবের নাবালক শিশুকে কাজ করতে হয়। উপার্জন করতে হয়। অনেক সময় পরিবারের বিধাব মা, অসুস্থ বাবা অতবা তার চেয়ে ছোট ভাইবোনের আহার যোগাতে হয়। অতএব, গরিবের কাজ না থাকলে উপায় নেই। প্রয়োজনে চুরি করতে হয়। কিন্তুু, এদেশে বড় চোরদের কদর আছে। ছোট চোরদের পদে পদে বিপদ। ক্ষমতাসীনদের চুরিকে দুর্নীিত বলে। আমাদের দেশে দুর্নীিতবাজদের বিরাট দাপট। বিরাট ক্ষমতা। সৎ মানুষেরা দুর্নীিতবাজদের দাপটকে ভয় পায়। কিন্তুু ছোট চোররা ধরা পড়লে আর উপায় নেই। তাদের দৌড়ে গিয়ে ধরে তাদেরই মত গরিবেরা। মারেও গরিবেরা। বড় চোরদের মারতে না পারার ঝালটা ছোট চোরদের মেওে মিটায়। এসব কোন কিছুই সরকারের অজানা নয়। তারপরও সরকার ''শহর সুন্দর করার জন্য'' গরিবদের বাঁচার পথ বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থায় গরিবদের সামনে একটা পথই খোলা আছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।
ঢাকা শহরে রিকশা চালায় ও রিকশার ব্যবসা করে এমন লোকের সংখ্যা দুই থেকে তিন লক্ষ। এদের আয়ের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে এদের পরিবারের ১৫/২০ লক্ষ মানুষ। আর রিকশা চালক ও রিকশা মালিকেরা যে টাকাটা বাজারে খরচ করে সেটা অন্যদের আয়। সেই আয়ের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে আলো ১০/১৫ লক্ষ মানুষ। এই মানুষগুলি ছোট দোকানদার ও রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে রিকশা পার্টেসর ব্যবসায়ী পর্যন্ত।
সরকার ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি চায়। রিকশা তুলে দিলে অথবা হ্রাস করলে যে ব্যবসা সঙ্কুচিত হয় সেটা সরকার বুঝে না যে তা নয়। তাহলে কার স্বার্থে রিকশা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ? শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি হলো এই উদ্যোগের ঘোষিত লক্ষ্য। ট্রাফিক সমস্যার মূলে রয়েছে যানজট। এই যানজট শুধু ঢাকা শহরেই নয়। চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও অন্যান্য মফঃস্বল শহরেও দুর্বিষহ যানজট লক্ষ করা যায়। তার কারণ রিকশার ভীড়। সরকার শুধুমাত্র ঢাকা শহরকে যানজট মুক্ত করতে রিকশা তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে। অন্য কোথাও এই উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন? তার কারণ অন্য কোথাও এত প্রাইভেট-কার চলে না যেমন ঢাকায় চলে। প্রাইভেট কার চলাচলের সুবিধার জন্যই রিকশা তুলে দেওযার উদ্যোগ। এরকম উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। আগের সরকারগুলিও একই উদ্যোগ নিয়েছে। এরশাদ যখন এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে রিকশা চলাচল বন্ধ করে ওই সড়ককে ভি-আই-পি সড়ক করেন তখন তিনি এক উদ্ভট যুক্তি দাঁড় করান। বিদেশীরা দেশে এসে রাস্তায় রিকসা দেখলে দেশের সম্মান হানি হয়। দেশের মানুষ যে রিকশা চালায় সেটা বড় নয়। বিদেশীরা কি মনে করছে সেটা বড়। আসলে রিকশা না থাকলেও বিদেশীরা ঠিকই জানে যে আমরা ভিক্ষুকের জাতি। ভিক্ষা ছাড়া আমাদের সরকারের চলে না। এই দেশেরই কোন সরকার যখন দেশের সম্মান রক্ষার জন্য ভিআইপি সড়ক করেছে বলে প্রচার করে তখন আর বুঝতে বাকী থাকে না যে সেই সরকার এদেশের মানুষকে কত বোকা মনে করে।
প্রাইভেট-কার চলাচলের সুবিধার জন্যই ভি-আই-পি সড়ক করা হয়েছে। এদেশে প্রাইভেট-কার একটা বিলাসিতা। আর রিকশা গরিবদের বাঁচার অবলম্বন। তারপরও শহরে এমন একজন রিকশা চালক পাওয়া যাবে না যে বুঝে না যে রিকশা চালানো মানুষের কাজ নয়। এমন একজন রিকশা মালিক পাওয়া যাবে না যে উপলব্ধি করে না রিকশার ব্যবসায় কোন সম্মান নেই। তারপরও মানুষ রিকশা চালায়, রিকশার ব্যবসা করে। তার জন্য দায়ী সরকার। এই সরকার না হলে আগের সরকার। মানুষের জন্য কাজের ব্যবস্থা না করে রিকশা তুলে দেওয়ার বা রিকশা চলাচলের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করার অর্থ গরিবদের স্বার্থেক জলাঞ্জলি দেওয়া। এটা আজকে আর গরিব মানুষ মেনে নেবে না। বিশেষ করে ঢাকা শহরের রিকশা চালক ও রিকশা মালিকেরা মেনে নেবে না। অতীতের সরকারগুলিকে ঢাকা শহরের রিকশাচালক ও রিকশামালিকেরা যে চোখে দেখেছে সেই চোখে বর্তমান সরকারকে দেখে না। তাদের ধারণা আওয়ামী লীগ সরকার গরিবের সরকার, নির্যািতত মানুষের সরকার। অন্ততঃ আওয়ামী লীগ সরকার ধনীদের স্বার্থেক গরিবদের স্বার্থের উধ্র্বে স্থান দেবে না। এখন যদি তারা দেখে বা মনে করে যে আওয়ামী লীগ সরকার আর সব সরকারের মতই ধনীদের স্বার্থেকই উধ্র্বে স্থান দিয়েছে তাহলে তাদের প্রত্যাশা প্রচন্ড মার খাবে। সেই পরিস্থিতিতে গরিবদের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক হবে না। বাঁচার অবলম্বন থেকে বঞ্চিত মানুষের মরীয়া হয়ে উঠা নতুন নয়।