অনেকেই নিউজ উইকের এই রিপোর্টের সাথে হুবহু একমত হবে না। তবুও একথা অস্বীকার করা যাবে না যে এধরনের সম্মেলন অর্থহীন। এসব অর্থহীন সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য অর্থ ব্যয় দেশের অর্থের অপচয়। এইসব সম্মেলন শেষ করে যখন তৃতীয় বিশ্বের নেতানেত্রীরা দেশে ফিরে আসেন তখন দলের লোকজন তাঁদের আকাশে তুলে ধরে যেন নেতানেত্রীরা বিশ্ব জয় করে ফিরেছে। এর পিছনে উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। জনগণকে বোকা বানানো এবং জনগণের দৃষ্টি মূল সমস্যা ও তার সমাধান থেকে অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়া। তবে মনে হয় এই ভাঁওতাবাজীর দিন শেষ হয়ে আসছে। কিছু মানুষকে সব সময় এবং সব মানুষকে কিছুদিন বোকা বানানো গেলেও সব মানুষকে সব সময় বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। অবশেষে মানুষ শিখে ফেলে।
অজ্ঞতার মূল্য:
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারটা অত ভাল বুঝেন না। আর তাঁর অর্থমন্ত্রী বলেছেন তিনি শেয়ার মার্কেট ভাল বুঝেন না। একেবারে সোনায় সোহাগা! পৃথিবীতে কেউ সব কিছু জানে না। অনেকে না জেনেও না জানার ভান করে। এদেশে এরকম মানুষের সংখ্যা অনেক। এদেশেজানিনা একথাটা খুব কম মানুষই স্বীকার করবে। তাই মানুষকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে ভুল ঠিকানা দেখিয়ে দেয়। তবুও বলবে না, আমি জানি না। জানি না বলাটাকে আমরা খুবই লজ্জার ব্যাপার মনে করি। তবে অজ্ঞতা বেশিদিন চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে চারপাশে যদি জ্ঞানবুদ্ধি সমপ্ন মানুষ থাকে তাহলে অজ্ঞতা বেশিদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। এদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী অজ্ঞতা স্বীকার করে সততার পরিচয় দিয়েছেন বলতে হবে। তবে আধুনিক দেশের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী যদি ব্যবসা-বাণিজ্য অথবা শেয়ার বাজার না বুঝেন তাহলে সেটা মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের দেশের শেয়ার মার্কেেটর বর্তমান অবস্থা তার প্রমাণ। শেয়ার মার্কেেটর বিপর্যয় সরকারের অজ্ঞতারই প্রতিফলন। শেয়ার মার্কেেটর বিপর্যেয়র আরও একটা কারণ শেয়ার বাজারের ক্ষুদে বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞতা। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের অজ্ঞতা। মধ্যবিত্তরা কাজ না করেই (এদেশের মধ্যবিত্তরা সবসময়েই কর্মিবমুখ) অল্প সময়ের মধ্যে লাখপতি বা কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। লোভ তাদের পাগল করে তুলেছিল। ফলে মধ্যবিত্তরা তাদের স্বাভাবিক সাবধানতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে তাদের সর্বস্ব শেয়ার মার্কেেট 'বিনিয়োগ' করেছে। সর্বস্ব 'বিনিয়োগ' করে তারা সর্বস্বান্ত হয়েছে। যারা শেয়ার বাজারে 'বিনিয়োগ' করেছে তারা কোন কিছু না বুঝেই 'বিনিয়োগ' করেছে। এই সুযোগটা নিয়েছে ঘাঘু দেশী ও বিদেশী বড় ধনীরা। তারা এক মাসের মধ্যে অজ্ঞ মধ্যবিত্ত 'বিনিয়োগকারীদের' সর্বস্ব আত্মসাৎ করে শত শত কোটি টাকা নিয়ে সরে পড়েছে। এখন এই মধ্যবিত্তরা পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের আশা সরকার একটা কিছু ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা করবে। লন্ডনের প্রখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা 'দি ইকোনোমিস্ট' বাংলাদেশের শেয়ার বাজারের ঘটনাবলীকে বলেছে 'নিস্পাপের বলী'। নিস্পাপ ব্যক্তিরা পরকালে ভাল করলেও ইহকালে পাপীদের হাতে মার খায়। কিন্তু, পাপীদের হাতে নিস্পাপদের বলী হওয়ার জন্য শুধু কি পাপীরাই দায়ী? সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এধরণের ঘটনা কি সম্ভব হত? সরকারের দায়িত্ব হলো দুষ্টের দমণ শিস্টের পালন। শেয়ার বাজারের ক্ষেত্রে বিপরীতটাই হয়েছে বলতে হয়। যে সমস্ত ধনী বা পুঁজিপতিরা বাজারে শেয়ার ছেড়েছে তাদের অনেকেই ব্যাংকের ঋণ ও অন্যান্য দায় পরিশোধ করতে পারছিল না। এরকম অনেক কোম্পানী হয় একেবারে বন্ধ ছিল অথবা দেউলিয়া হওয়ার মত অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছিল। এসব 'কোম্পানী' বাজারে শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন পেল কি করে সেই প্রশ্নের জবাব সরকারকেই দিতে হবে। এরা ক্ষমতাসীনদের প্রভাবিত করেই শেয়ার বাজারে শেয়ার ছাড়ার অনুমতি লাভ করেছে এবং অজ্ঞ, লোভী মধ্যবিত্ত 'বিনিয়োগকারীদের' অর্থ-সম্পদ হরণ করে নিয়েছে। সেই সাথে জাতীয় সম্পদও হরণ করেছে।
দেবতাদের সন্তুস্টির জন্য নিস্পাপদেরই বলি দিতে হয়। শেয়ার বাজারের নিস্পাপদের বলি দিয়ে দেশী বিদেশী ধনীদের সন্তুুষ্ট করা হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শুরুতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের জন্য লুটপাটেরই আশ্রয় নিতে হয়েছে। এটা সবাই জানে। তারপরও এই অর্থৈনতিক ব্যবস্থা টিকে আছে ও বিকশিত হয়েছে তার কারণ 'সঞ্চিত' সম্পদকে পুঁজিপতিরা অধিক সম্পদ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করেছে। নিজেদের ভোগবিলাসে অপচয় করেনি। ইংল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ কেইনস বলেছিলেন, পুঁজিপতিরা যদি 'সঞ্চিত' সম্পদ ফুর্তি করে উড়িয়ে দিত তাহলে অনেক আগেই পুঁজিবাদী অর্থৈনতিক অবস্থা উচ্ছেদ হয়ে যেত। আমাদের অর্থৈনতিক ব্যবস্থা এধরনের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নয়। অবশ্য নিস্পাপদের বলির পরিণতিতে যদি বিনিয়োগ বেড়ে যায় সেটা ক্ষমার যোগ্য অপরাধ। এখানে তা হয় না। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারী ধনীদের অনেকে পুঁজিপতি বা বিনিয়োগকারী বলে। প্রকৃতপক্ষে এরা পুঁজিপতি অথবা বিনিয়োগকারী, কোনটাই নয়। এরা স্রেফ লুটেরা। একটা দেশের সম্পদ উৎপাদন কখনও সে দেশের ধনরা কি পরিমাণ ধন-সম্পদের অধিকারী তার উপর নির্ভর করে না। দেশটি কি প্রযুক্তি স্থাপন করেছে বিশেষ করে(মানুষ এবং পশুর) পেশী শক্তির পরিপূরক হিসাবে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ ও অন্যান্য যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করছে তার উপর একটা দেশের সম্পদ উৎপাদনের ক্ষমতা নির্ভর করে। এটা দিয়েই আমাদের দেশের সাথে উন্নত দেশের পার্থক্য। শিল্পন্নোত পুঁজিবাদী দেশগুলি তাদের শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে যে উন্নত কলাকৌশল ব্যবহার করে তার জন্য বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। এ থেকেই পুঁজির প্রশ্ন আসে। পুঁজির জন্য সঞ্চয় প্রয়োজন। অপরিহার্য খাওয়া-পরার পর উদ্বৃত্ত সম্পদ যখন উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ হয় তখনই তা পুঁজির আকার ধারণ করে। পুঁজিবাদী সমাজে উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্য লাভ বা মুনাফা। শুধুমাত্র সম্পদ জড়ো করার উদ্দেশ্যে যারা টাকা খাটায় তারা প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগকারী অথবা পুঁজিপতি নয়। এসব 'বিনিয়োগকারীরা' কলকারখানা (উৎপাদন যন্ত্র) স্থাপন করার উদ্দেশ্যে তাদের সম্পদ বিনিয়োগ করে না। এসব ব্যক্তি যখন টাকা খাটায় তখন সেটা জাতীয় সম্পদ উৎপাদনকে সাহায্য করার পরিবর্তে বাধাগ্রস্ত করে। শেয়ার মার্কেট থেকে যারা শত শত কোটি টাকা নিয়ে সরে পড়েছে তারা দেশের সম্পদ উৎপাদনকে সাহায্য করেনি। বিশেষ করে যে বিদেশী 'বিনিয়োগকারীরা' শেয়ার বাজারের মুনাফা বিদেশে নিয়ে গেছে তারা দেশকে দরিদ্র করেছে। একইভাবে যারা শেয়ার বাজার থেকে অর্জিত মুনাফা ভোগবিলাসে অপচয় করছে তারা দেশকে দরিদ্র করছে। এই 'বিনিয়োগ' জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি করেছে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ব্যবসা-বাণিজ্য বুঝেন না এবং অর্থমন্ত্রী শেয়ার বাজার ভাল বুঝেন না তাই এসব দেশী-বিদেশী লুটেরারা সরকারের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়েছে। আমাদের দেশে শেয়ার বাজার উৎপাদনকে সাহায্য করার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এদেশের শেয়ার বাজার গরিবের ঘোড়া রোগ। এটা বুঝতে না পারার দরুন জাতি এবং দেশের মধ্যবিত্তদের চড়া দাম দিতে হয়েছে। জাতীয় সম্পদ উৎপাদনের স্বার্থে হয় শেয়ার বাজার বন্ধ রাখতে হবে নতুবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সমস্যা সমাধানের সমস্যা:
সরকারের কথাবার্তা শুনে মনে হয় দেশের বা জনগণের সমস্যাটা কি এবং তার সমাধানের পথ কি তা সরকার জানে না। কখনও শুনি শিক্ষার অভাবই আমাদের প্রধান সমস্যা। কখনও শুনা যায় দুর্নীিত আমাদের প্রধান সমস্যা। আবার কখনও আইন শৃঙ্খলাকে প্রধান সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কদিন আগে প্রধানমন্ত্রী বললেন অপুষ্টি দূর করার জন্য শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীর কথাটা খুবই জটিল মনে হয়েছে। ক্লাস থ্রির পাঠ্য বই থেকে শুরু করে পুষ্টি বিদ্যার বইয়ে উল্লেখ আছে যে, আমিষ বা মাছ মাংস থেকে পুষ্টি আসে। শিক্ষ কিভাবে পুষ্টির অভাব দূর করতে পারে সেটা সহজে বুঝা যায় না। হয়তো শিক্ষা হলে খাবারের গুণাবলী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা জন্মে সেটা বলাই উদ্দেশ্য। কিন্তুু, তাতেই কি পুষ্টির অভাব দূর হয়? পুষ্টিকর খাবারের অর্থ কম পক্ষেডালভাত শাক-সবজি ও ফলমূল। মাছ মাংস না হয় বাদই দেওয়া হলো। তবুও পুষ্টিকর খাবার খেতে হলে বেশ টাকার দরকার। ডালের দাম ৫০/- টাকা সের। তাছাড়া বিশুদ্ধ ডাল পাওয়া যায় না। ডালে পোকার ওষুধ ছিটানো হয়। এসব ডাল বিষাক্ত। পুষ্টির পরিবর্তে শরীরের ক্ষতি করে। শাক-সবজির ও অনেক দাম। সেটা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা টের নাও পেতে পারে। দেশের মানুষ ঠিকই বুঝে যে, প্রয়োজনমত ডাল-ভাত, শাক-সবজি খাওয়া কত দুস্কর। এই খাদ্য যোগাড় করার টাকা এদেশের শতকরা ৮০ জন মানুষেরই নেই। শিক্ষার বিস্তার ঘটানোও সহজ ব্যাপার নয়। শিক্ষার সুযোগ থাকাটাই বড় কথা নয়। শিক্ষার সুযোগ নিতে হলেও টাকার দরকার। এদেশে ধনীরা এবং ধনীদের ছেলেমেয়েরা কদাচিৎ অশিক্ষিত। সাধারণত গরিবেরা ও গরিবের ছেলেমেয়েরাই অশিক্ষিত। দারিদ্রের কারণেই মানুষ অশিক্ষিত। চরম দারিদ্র মানুষকে মনুষত্বের মহিমা থেকে বষ্ণিত রাখে। অতএব, শিক্ষার ক্ষেত্রেও দারিদ্র সমস্যা। এই অবস্থায় যখন প্রধানমন্ত্রী অথবা মন্ত্রীরা বলেন অপুষ্টি দূর করার জন্য শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে তখন মনে হয় তাঁরা সমস্যাটাই ধরতে পারেননি। এরকম আরও কথার উল্লেখ করা যায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশকে দারিদ্র বেকারত্ব ও মাস্তানমুক্ত করা হবে। বেকারমুক্ত করতে পারলে দেশ এমনিতেই মাস্তানমুক্ত হয়ে যাবে। অঅর বেকারমুক্ত হলে দেশ দারিদ্রমুক্ত হওয়ার পথে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে দেশকে বেকারত্বমুক্ত করাটাই সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি।
পৃথিবীর প্রতিটি জাতি অন্তহীন সমস্যার সম্মুখীন হয়। একটা ঐতিহাসিক স্তরে কোন সমস্যাটা সমাধান করতে পারলে অন্য সব সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে সেটা বুঝতে হবে। যে রাজনৈতিক দল বা সরকার এটা বুঝতে পারে না সেই দল বা সরকারের পক্ষে কোন সমস্যারই সমাধান করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে একাধিক সমস্যার সমাধানের কথা বলতে শুনা যায়। এথেকে এই ধারণাই সৃস্টি হয় যে অবশেষে সরকার কোন সমস্যারই সমাধান করতে সক্ষম হবে না। সরকার যদি আমাদের অন্তহীন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিক হয় তাহলে প্রধান সমস্যাটা কি সেটা ঠিক করতে হবে। আমাদের প্রধান সমস্যা বেকারত্ব দারিদ্র। এই দুই সমস্যা কেন সৃষ্টি হয়েছে সেটা না বুঝলে তার সমাধান কোনদিন হবে না। বেকারত্ব দারিদ্র দূর করতে হলে উৎপাদন কর্মক্ান্ড কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। আর কোন পথেই বেকারত্ব দারিদ্র দূর করা সম্ভব নয়। উৎপাদন কর্মকান্ড কয়েক গুণ বাড়াতে হলে বর্তমানে যে সম্পদ উৎপাদন হবে সেই উৎপাদিত সম্পদের সুষ্ঠু বল্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবীর সব দেশই বেকারত্ব ও দারিদ্র দূর করার জন্য এপথই বেছে নিয়েছে। বিকল্প কোন পথ নেই। এদশের সরকারকেও এপথই বেছে নিতে হবে। কিন্তুু, এপথ বেছে নেওয়াটাই একটা বিরাট সমস্যা। কেন সমস্যা সেটা ব্যাখ্যা করা দরকার।
আমরা প্রায়ই শুনি যে পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ (সিঙ্গাপুর, হংকং, কোরিয়া, চীন প্রভৃতি) অর্থৈনতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য লাভ করেছে। এই বিস্ময়কর সাফল্যের পিছনে রহস্য নেই। এসব দেশ উৎপাদন কর্মকান্ডে বিশাল সম্পদ বিনিয়োগ করে। এক সময় আমেরিকা জাপান ও ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলি কমিউনিজমের বিস্তার রোধ করার জন্য এসব দেশকে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খুবই সাহায্য সহযোগিতা করেছে। ফলে বিশাল আকারে সম্পদ বিনিয়োগ লাভজনক হয়েছে। এখন পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি বিশ্ব বাজারে আমেরিকা এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশেরই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এসব দেশ কি তাদের বিস্ময়কর অগ্রগতি বা ইকনোমিক মিরাকল অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে? বিশ্বব্যাংক এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মনে করে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে অর্থৈনতিক অগ্রগতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ অনেকদিন অব্যাহত থাকবে। সব দেশের জন্যই অর্থৈনতিক অগ্রগতি নির্ভর করে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের উপর। ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। যে ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ যত বেশি সেই ব্যবসার আকারও তত বড়। অতএব বিনিয়োগই দারিদ্র ও বেকারত্বমুক্ত দেশ গড়ে তোলার চাবিকাঠি। সম্পদের সঞ্চয় ছাড়া বিনিয়োগ সম্ভব নয়। ভোগ বা খরচ বাদ দিয়ে যে সম্পদ থেকে যায় তাকেই সঞ্চয় বলে। অতএব, ভোগ যত কম হবে সঞ্চয় তত বেশি হবে। আমরা যুগ যুগ ধরে শুনে এসেছি যে আমরা গরিব। অপরিহার্য ভোগের জন্যই আমাদের যথেষ্ট সম্পদ নেই। আমরাও এতদিন ভেবেছি এটা একবারে খাঁটি কথা। আমাদের অবস্থা যেখানে নুন আনতে পান্থা ফুরায় সেখানে আমরা বিনিয়োগের জন্য কি সঞ্চয় করতে পারি? কিন্তুু এই অবস্থাটা (নুন আনতে পান্থা ফুরানোর অবস্থাটা) ব্যাপক জনগণের হলেও সবার এই অবস্থা নয়। এদেশে কিছু মানুষ আছে যাদের বিলাসবহুল জীবন উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ধনীদেরও ঈর্ষার বিষয়। এসব মানুষের ভোগবিলাসে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অপচয় হচ্ছে। এদের ভোগবিলাস বন্ধ হলে উৎপাদন কর্মকান্ডের জন্য কয়েকগুণ বেশি সম্পদ বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। এটা করতে হলে নতুনভাবে সম্পদ বন্টন করতে হবে। অর্থাৎ, যারা আজকে ভোগবিলাসে সম্পদ অপচয় করছে তাদের সম্পদ তাদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে হবে। বিলাসিতার জন্য সম্পদ অপচয় করা নিষিদ্ধ করতে হবে। তাহলেই আমাদের দেশ দারিদ্র-বেকারত্ব ও সন্ত্রাসমুক্ত হবে। একথা মুখে বলা যথেষ্ট নয় যে দেশকে দারিদ্র-বেকারত্ব ও সন্ত্রাসমুক্ত করার জন্য সম্পদেও নতুন বন্টন ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু করতে হবে। অর্থাৎ যারা ভোগবিলাসে সম্পদ অপচয় করে তাদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে হবে এবং ভোগবিলাসে সম্পদ অপচয় করা নিষিদ্ধ করতে হবে। তাহলে আমরাও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মতই অর্থৈনতিক বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারব। এখন পর্যন্ত আমরা তা পারিনি কারণ এদেশে কোন সরকারই একাজটা করেনি। মনে হয় অতীতের সরকারগুলি যা করতে পারেনি বর্তমান সরকারও তা পারবে না। দাইরদ্র-বেকারত্ব সন্ত্রাসমুক্ত এবং আরও অনেক সমস্যামুক্ত বাংলাদেশ একটা কথার কথাই থেকে যাবে।
এখানেই নৃত্য কর:
প্রাচীন গ্রিসের রোডস্ নগরীর এক নাগরিক দীর্ঘিদন শহর থেকে অনুপস্থিত থাকার পর রোডস্ শহরে ফিরে এল। শহরের অধীবাসীদের ডেকে সে বলল যে, যেখানে গিয়েছিল সেখানে এমন নাচ নেচেছিল যে সবাই সেই নাচ দেখে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছিল। রোডস্ নগরীর অধিবাসীদের দুর্ভাগ্য যে তাঁরা সেই অপরূপ নৃত্য দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একথা রোডসের নাগরিকরা বলল, তাতে কি? এইত রোডস্। এখন এখানেই নাচ। আমরা সেই অপরূপ নাচ দেখি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী রোমে বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মেলনে ভাষণদানকালে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নাকি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছে। কিন্তুু, আমাদের দেশের ক্ষুধার্ত মানুষ যারা জনসংখ্যার প্রায় শতকরা আশিজন তারা প্রাচীন রোডস্ নগরীর অধিবাসীদের মতই বলবে, পৃথিবীর ক্ষুধার্তেদর কি করা হবে সেটা জানার দরকার। এখানেইত আছে কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষ। এদেশকে ক্ষুধামুক্ত কর। আর প্রধানমন্ত্রীর কথা ধরেই বলতে হয়, 'একাজটা করতে হবে আজই, এখনই। আগামীকাল বা পরের দিনের জন্য তা তুলে রাখলে চলবে না। কারণ, ক্ষুধা কারো জন্য অপেক্ষা করে না।' বড় খাঁটি কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষুধার জ্বালা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্বালা। এই জ্বালা নিবৃত্ত করার জন্য অপেক্ষা করা যায় না। কিন্তুু দুঃখ আমাদের, এদেশের মানুষ অপেক্ষা করে। এ দেশে প্রতি রাতে কোটি কোটি শিশু ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে ঘুমায়। শহরের রাস্তাঘাটে অথবা ফুটপাতে ক্ষুধার্ত কঙ্কালসার মানুষ পড়ে থাকে। তারপরও ক্ষুধার্ত মানুষেরা অপেক্ষা করে। কিসের আশায় তাদের এই প্রতীক্ষা? এই অবস্থায় পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষই বিদ্রোহ করত। আমাদের দেশের মানুষের রক্তে বিদ্রোহ নেই। ক্ষুধা সহ্য করে, ক্ষুধা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। প্রধানমন্ত্রী রোমে বলেছেন ক্ষুধা কারো জন্য অপেক্ষা করে না। একবারেই করে না বলা যাবে না। ক্ষুধা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার আকাঙক্ষা কবে পূরণ হবে কেউ জানে না। আদৌ পূরণ হবে কি না সেটাও কেউ জানে না। তবে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাঙক্ষা পূরণ করা সম্ভব এখনই। এই মুহূর্তে। রোমে প্রধানমন্ত্রী ভাঙ্গা লাঙ্গল কাঁধে কৃষকের জিজ্ঞাসা শোনার আগ্রহের কথা বলেছেন। এই কৃষক বাংলাদেশের কৃষক। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা ইটালীর কৃষক নয়। এই কৃষকের জিজ্ঞাসা শুনার আগ্রহ প্রকৃতপক্ষে বিদেশীদের নেই। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সেই আগ্রহ থাকতে হবে। তাঁকে অপেক্ষা না করে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।