সিরাজ সিকদারের মৃত্যু হয়েছে ২৩ বছরেরও আগে। এতদিন পর কেন এই দাবি, এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। খালেদা জিয়া একসময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ইচ্ছা করলেই সিরাজ সিকদারের বিচারের ব্যবস্থা করতে পারতেন। সেটা করাই সঠিক ছিল। তাই সময় থাকতে সঠিক কাজটি না করে আজকে যখন তিনি সিরাজ সিকদারের হত্যার বিচারের কথা বলেন তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। তবে ইংরেজীতে একটা কথা আছে একেবারেই না করার চেয়ে দেরিতে করাও ভাল। এখন দেখা যাক খালেদা জিয়া এই লক্ষ্যে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তিনি যদি তাঁর লক্ষ্য সম্পর্কে আন্তরিক হন তাহলে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে সেটা হলো ১৯৭২-৭৫ সময়ে যে তরুণদের শেখ মুজিব ও তাঁর সরকার হত্যা করেছিল তাদের কি আদর্শ ছিল সেটা জনগণকে বলা। ওই সময় যেসব তরুণকে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে থেকে যাদের নাম ধাম ও পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভব তা সংগ্রহ করতে হবে। এদের যেভাবে হত্যা করা হয় তার একটি চিত্র তুলে ধরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করতে হবে। খালেদা জিয়া যখন এই কাজগুলি করবেন তখন মানুষ তাঁর কথা ও কাজের মিল খুঁজে পাবে। মানুষ সে সময়ের ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবে। ইতিহাসের যে কালো অধ্যায় চাপা পড়ে গেছে সেটা সম্পর্কে জনগণ জানবে। তার পরিণতিতে তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার ও সরকার প্রধানের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন হবে যা এতদিন মিথ্যা দিয়ে চাপা রাখা হয়েছে।
শোক দিবস: সেদিন ও আজ
১৫ আগষ্ট সরকারীভাবে জাতীয় শোক দিবস। শোক দিবস উপলক্ষে সারা আগষ্ট মাস জুড়েই সরকারীভাবে শোক করা হয়। কিন্তু, জনগণের মধ্যে শোকের কোন ছায়া ছিল না। কোন কোন পত্রপত্রিকায় বিশেষ করে সরকার সমর্থক পত্রিকায় যদিও বলা হয়েছে যে শোক করার জন্য মানুষের ঢল নেমেছে। সেই ঢল চোখে পড়েনি। এদেশে পত্রিকার কথা বিশ্বাস করে আহাম্মকেরা। একই বিষয়ের উপর এক এক পত্রিকার এক এক খবর। অনেকটা ঘড়ির মতই ব্যাপার। সব ঘড়ি এক সময় দেয় না। এক এক ঘড়েিত এক এক সময়। কিছুদিন আগে ঢাকার পল্টন ময়দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণসম্বর্ধনা দেওয়া হয়। এই বিষয়ের উপর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার খবরের শুরু ছিল এরকমঃ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে লক্ষ জনতার শান্তি ও সম্প্রীতি মহাসমাবেশে------। ইত্তেফাক পত্রিকার আরও খবর ছিলঃ----------বেলা ৩টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে ভিজিতে ভিজিতে কেহবা ছাতা মাথায় জনতার মিছিলে পল্টন ভরিয়া যায় এবং ৫টার দিকে গোটা পল্টন ময়দান ভরিয়া পাশ্ববর্তী স্টেডিয়ামের বারান্দা লোকে-লোকারণ্য হইয়া যায়। অথচ, এই বিষয়ের উপর সাপ্তাহিক যায় যায় দিনের স্বদেশ রায় যে খবর দেন তা থেকে একেবারে বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। যায় যায় দিনের স্বদেশ রায়ের লেখার শিরোনাম ছিল: বড় প্রচার ছোট জনসভা। স্বদেশ রায়ের খবরের কিছু অংশ: এক হাজার একজন বুদ্ধিজীবি আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান নিয়ে একটা রব উঠেছিল বেশ আগে থেকেই। হাইকোর্ট বার থেকে কলেজ ক্যান্টিন অবধি বিভিন্ন আলোচনায় অনেকেই মন্তব্য করে চার পাঁচ লাখ লোকের সমাবেশ হবে। এই সকল ধারণা, সকল আলোচনার বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন ১৫ই জুলাই পৌনে ছয়টায় শেখ হাসিনা নিজেই। তিনি যখন মাইকের সামনে আসেন এবং মাঠের চারদিকে তাকান তখন দ্রুতই তার মুখটা অনুজ্জ্বল হয়ে যায়। কারণ, শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথমবারের মত সবচেয়ে ছোট জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
শেখ হাসিনা যখন বক্তব্য রাখার জন্য ওঠে দাঁড়ান তখন সামনে প্যান্ডেলের চেয়াওে বসে থাকা হাজার খানেক আমন্ত্রিত অতিথি ছাড়া সমস্ত মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শ'খানেক ঘাট শ্রমিক, শ'খানেক গার্মেেন্টসের কর্মী ও কয়েকজন আওয়ামী লীগ এম.পি. দাঁড়িয়েছিলেন। তার বক্তব্য শুরু হতেই স্টেডিয়ামের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের ভেতর থেকে আরো প্রায় শ'পাচেক লোক মাঠে নেমে আসে। প্যান্ডেলে বসে থাকা ও মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা এইসব মিলিয়ে হাজার দুয়েক লোকের সামনে শেখ হাসিনা তার বক্তব্য রাখেন।
এই দুই খবরের কোনটি জনগণ বিশ্বাস করবে? মন্ত্রীর মালিকানাধীন পত্রিকার খবর না এরশাদ আমলের সংগ্রামী সাপ্তাহিক পত্রিকার খবর। একটা বিষয় পরিস্কার। এদেশে পত্রিকার ছাপা খবর পড়ে যারা মনে করে লক্ষ জনতার মহাসমাবেশ ঘটেছিল অথবা জনতার ঢল নেমেছিল তারা খুবই সরল মানুষ।
১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসে একজন মজুর তার অনুভূতি ব্যক্ত করেছে এভাবে ''আমাদেরই শোকের সীমা নেই। বন্যার পানিতে বাড়িঘর ডুবে গেছে। ঘরে খাবার পানি নেই। জিনিষপত্র কিনতে পারি না। ছেলেমেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকাই মুস্কিল। আমরা আবার কার জন্য শোক করব। নিজের শোকেই বাঁচি না।'' দেশের আপামর জনগণ দুঃখ দুর্দশায় জর্জিরত। তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। সরকারী শোক দিবস নিয়ে তাদের কোন চিন্তা নেই। শুধু সরকার ঘেঁষা ব্যক্তিরা উৎসাহের সাথে জাতীয় শোক দিবস পালন করেছে। কিন্তু, যেদিনের ঘটনা নিয়ে আজকের জাতীয় শোক দিবস সেদিন এইসব উৎসাহী ব্যক্তিদের দেশের কোথাও শোক পালন করতে দেখা যায়নি। আর তখনকার সাধারণ মানুষের অনুভূতি শোকের ধারে কাছেও ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতায় মানুষ প্রথমে হতচকিত ছিল। কিন্তু শীঘ্রই তারা বুঝতে পেরেছে সাড়ে তিন বছর ধরে যে পাথরের নীচে তারা চাপা পড়েছিল সেই পাথরটা সরে গেছে। তাই সেদিন দেশের আপামর জনগণ শোক পালন করেনি। তাদের মনে ছিল মুক্তির আনন্দকে আচ্ছন্ন করেনি। জার্মান কবি ও দার্শিনক গেটের কথায় বলা যায়, এই ব্যথা কি আমাদের বেদনাহত করবে যা আমাদের দেয় মুক্তির আনন্দ।
রক্তের দাম:
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের কল্যাণে প্রয়োজন হলে তিনি তাঁর শেষ রক্তবিন্দুটিও বিসর্জন দেবেন। একথা শুনে দেশের সহজ সরল পাবলিকদের মধ্যে অনেকে হয়তো মনে করবে, কি মহান প্রধানমন্ত্রী। আহা, শেষ রক্তবিন্দুও দিয়ে দিতে প্রস্তুত। আসলে, জনগণের কল্যাণে রক্ত বিসর্জন দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। একসময় এর প্রয়োজন থাকলেও আজকের বাংলাদেশে কোন প্রধানমন্ত্রীর রক্ত বিসর্জন একেবারেই নিস্প্রোয়জন। প্রথম বা শেষ রক্তবিন্দু কোনটারই দাম নেই। প্রধানমন্ত্রীর রক্তবিসর্জন দেওয়ার কথা শুনে মনে হয়েছে তিনি সস্তা কথা দিয়ে বাজিমাত করতে চান অথবা তিনি অতীতের মধ্যে বাস করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় রক্ত বিসর্জন প্রয়োজন ছিল। সেটা ছিল ২৭ বছর আগের ব্যাপার। তিনি যখন তখন রক্ত বিসর্জন দেন নাই তাহলে এখন রক্ত বিসর্জন দিয়ে কি হবে? আজকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে মানুষ যা চায় তা হলো তিনি ও তাঁর সরকার এমন পলিসি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যাতে মানুষের দুগর্তি ও সমস্যা সীমাহীন। এই মুহূর্তে বন্যাজনিত সমস্যায় দেশের অগণিত মানুষ জর্জিরত। ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে পশুর মত গাদাগাদি করে মানুষ পড়ে আছে। বিশাল এলাকা জুড়ে কৃষি উৎপাদন মার খেয়েছে। জিনিষপত্রের দাম বেড়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপে দেখা দিয়েছে। একসময় বন্যার পানি সরে যাবে। কিন্তু, মানুষের দুঃখদারিদ্র থেকে যাবে। বেকারত্ব থেকে যাবে। এই সমস্যাই আমাদের প্রধান সমস্যা। দারিদ্র ও বেকারত্ব। পৃথিবীর অনেক দেশেই বন্যা হয়। চীনে এবার ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। এমন বন্যা আর কখনও কোন দেশে হয়েছে বলে মনে করে না বন্যা বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু, বাংলাদেশের বন্যা ও চীনের বন্যার চেহারা একেবারেই ভিন্ন। বন্যায় এখানকার মানুষের জীবন যেভাবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সেরকম চীনে হয়নি। এখানকার মানুষ তাদের সামান্য সহায় সম্বল হারিয়ে একেবারেই ভিখারিতে পরিণত হয়ে যায়। এসব মানুষ সরকার থেকে যে সামান্য সাহায্য পায় সেটা এতই কম যে রীতিমত হাস্যকর। প্রধানমন্ত্রীর বেলন দিয়ে রুটি বানানোর ছবি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এই ছবি প্রধানমন্ত্রীকে হয়তো তৃপ্তি দেয়। কিন্তু, এর মধ্যে পরিস্থিতির দৈন্য ফুটে উঠে। মানুষকে রুটি খাওয়াতে পারাটাই পরম লক্ষ্য। যার জন্য প্রধানমন্ত্রী বেলন দিয়ে রুটি বানানোর ছবি পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয়েছে। এই দৃশ্য চীনে দেখা যায়নি। সেখানকার সরকার প্রধানের বেলন দিয়ে রুটি বানানোর ছবি পত্রিকায় স্থান পাবে না। চীন দেশে সেরকম ছবি ছাপা হলে সারা দেশে একটা হাসির রোল পড়ে যেত। এদেশের মধ্যেও বন্যার দুই চেহারা। ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকাও এবার বন্যা কবলিত হয়েছে। তাই বলে গুলশান বনানী বা বারিধারার বাসিন্দারা রুটির জন্য লাইন দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ত্রাণসমগ্রীর সামান্য প্যাকেট পাওয়ার জন্য অভিজাত এলাকার বাসিন্দারা লাইন দেয় না। ধাক্কাধাক্কি করে না। কারণ এর প্রয়োজন নেই। লাইন দিয়ে ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ করার দৃশ্য খুবই লজ্জার ব্যাপার। কিন্তু এদেশে এই ছবি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা এবং বিরোধী দলের নেত্রী ও নেতারা পরম তৃপ্তি লাভ করে। এতে তাদের রাজনৈতিক ফাঁয়দা হয়। ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এদেশের ক্ষুধার্ত দরিদ্র মানুষজানে না এভাবে ত্রাণসামগ্রী পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো বা ধাক্কাধাক্কি করা লজ্জার ব্যাপার। এদেশের রাজনৈতিক দলের নেতাত্রেীরা মানুষের একথাটা বোঝায় না। তারা মানুষের মধ্যে মর্যাদাবোধ জাগ্রত করতে আগ্রহী নয়। তারা চায় মানুষ আত্মমর্যাদাহীনই থাকুক এবং রাজনৈতিক দলের নেত্রী নেতাদের পূজা করুক। তাই, ত্রাণসামগ্রী নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো বা হুড়াহুড়ির গ্লানিকর দৃশ্য দেখে তারা মজা পায়। এই দৃশ্য আমাদের দেশের সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী নেতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেত্রীনেতাদের কাছে লজ্জাকর বলে মনে হয় না। কিন্তু, আমাদের জাতির জন্য এই দৃশ্য লজ্জাকর। এটা আমাদের বোঝা প্রয়োজন। মানুষকেও বোঝাতে হবে। আমাদের এই লজ্জার মূলে রয়েছে দারিদ্র ও বেকারত্ব।
দারিদ্র বেকারত্ব নিঃসন্দেহে আমাদের প্রধান সমস্যা। আমাদের আরও অনেক সমস্যার উৎপত্তি এই দারিদ্র ও বেকারত্ব থেকেই। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, পরিবেশ দূষণ, আইন শৃঙ্খলার অবনতি, সামাজিক অবক্ষয়, অশিক্ষা ইত্যাদি সমস্যার উৎস দারিদ্র বেকারত্ব। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা ইত্যাদিও আমাদের সমস্যা। কিন্তু, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদিও থাকবে। একে মোকাবিলা করেই আমাদের বাঁচতে হবে। মোকাবিলা করার অর্থ বন্যার পানিতে, ঝড়ে বা জলোচ্ছ্বাসে কীটপতঙ্গের মত মরে যাওয়া নয়। রিলিফের জন্য লাইন দেয়া নয়। মোকাবিলা করার অর্থ বন্যার অভিশাপকে আশীর্বােদ পরিণত করা। বন্যার কারণে আমাদের জমি উর্বর হয়। বাম্পার ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠে। বন্যার ক্ষতিকারক দিকগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেই বন্যা আমাদের জীবনকে লন্ডভন্ড করে দেবে না। বন্যা আমাদের জন্য আশীর্বােদ পরিণত হবে। বন্যার ক্ষতিকারক দিকগুলিকে মোকাবিলা করতে হলে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হবে। দুঃখদারিদ্র জর্জিরত অসহায় মানুষের দ্বারা বন্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তারা বড় জোর রিলিফের জন্য লাইন দিতে পারে। অতএব, সাহসের সাথে বন্যা মোকাবিলা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে আহবান রেখেছেন আজকের পরিস্থিতিতে সেই আহবান ফাঁকা। জনগণ যখন নিজের পায়ে শক্তভাবে দাঁড়াতে পারবে তখন যে কোন দুর্যোগ তারা ভালভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে। তখন প্রধানমন্ত্রীর আহবানের কোন প্রয়োজন হবে না। অতএব, আমাদের সব দুর্গিত ও দুঃখ দুর্দশার মূলে রয়েছে দারিদ্র ও বেকারত্ব। দারিদ্র ও বেকারত্ব দূর করতে না পারলে কোন সমস্যাই দূর হবে না। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারকেই দেশ থেকে দারিদ্র ও বেকারত্ব দূর করার উদ্যোগ ও কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সেটাই হবে প্রকৃত জনকল্যাণমূলক কাজ। এজন্য প্রধানমন্ত্রী এক বিন্দু রক্ত বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। তাকে যা করতে হবে সেটা হলো দারিদ্রের কারণ নির্ণয় করতে হবে এবং সেই কারণ অপসারণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার ক্ষমতায় এসেছে দুই বছরের বেশসময় পার হয়ে গেছে। তিনি এবং তাঁর সরকার এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি যার পরিণতিতে দারিদ্র বেকারত্ব দূর হচ্ছে বলে মনে হতে পারে। বরং দারিদ্র বেকারত্ব আরও বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার যদি দারিদ্র বেকারত্ব দূর করতে চান তাহলে তাঁর হাতে যে বাকী তিন বছর সময় আছে সেই সময়েরই মধ্যেই ভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন যে তাঁর ও তাঁর সরকারের লক্ষ্য হলো দারিদ্র দূর কওে জনগণের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু, চারপাশের অবস্থা দেখে মনে হয় না এভাবে দেশ চললে এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। দুঃখদুর্দশায় জর্জিরত মানুষ আজকেনির্বাক। হাসিত দূরের কথা। জনগণের মুখে হাসি ফোটাতে হলে আজকের সমাজকে বদলে ফেলতে হবে। সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করতে হবে। দেশের মানুষ না খেয়ে মরবে আর ধনীরা হাজারো বিলাসিতা করবে তা হতে পারে না। এই ব্যবস্থা টিকে থাকলে এদেশ কখনও উন্নত হবে না। মানুষ দারিদ্র বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে না। প্রধানমন্ত্রীও মনে হয় এই সত্য উপলব্ধি করেন। কারণ তাঁকে একদিকের দারিদ্র এবং অন্য দিকের বিলাসিতা নিয়ে কথা বলতে শোনা গেছে। এখন তিনি এই অন্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেন সেটা দিয়ে বোঝা যাবে তিনি দেশের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কতখানি আন্তরিক।
খাসালত খারাপ কার:
প্রধানমন্ত্রী শেক হাসিনা কোন এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, আমাদের খাসালত খারাপ হয়ে গেছে। কোন কিছু হলেই আমরা রিলিফের আশায় বসে থাকি। সাহায্য চাই। প্রধানমন্ত্রীর এই নিন্দা জনগণকে উদ্দেশ্য করে। প্রধানমন্ত্রীর কথাটা চিত হয়ে শুয়ে আকাশে থুথু ফেলার মতই। কথাটা তার কাছেই ফিরে আসে। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে আমরা রিলিফ বা সাহায্য পেলে খুসী হই। রিলিফ ও সাহায্য পেতে আমরা আগ্রহী। আমরা সরকারের কাছ থেকে রিলিফ ও সাহায্য চাই। কিছু লোক হয়তো আছে যারা রিলিফ চায় না। তাদের সংখ্যা খুবই কম। বলা যায় ব্যতিক্রম। নিয়ম হলো আমরা সবাই রিলিফ ও সাহায্য পেতে চাই। আমাদের এই খারাপ খাসালতের জন্য দায়ী সরকার। সরকারগুলিই আমাদের খাসালত খারাপ করেছে। এক্ষেত্রে অগ্রনায়ক হলো শেখ মুজিব ও ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ মুজিবের আমলে রিলিফের কম্বল ও রিলিফের মালে সারা দেশ ছেয়ে গিয়েছিল। তখন থেকেই শুরু হলো মানুষের রিলিফ ও সাহায্যের পেছনে ছোটা। স্বাধীনতার সংগ্রাম নিয়ে আমাদের সব অহঙ্কার শেখ মুজিব এক নিমেষে চুরমার করে দিলেন। চারিদিকে রিলিফ চুরির হিড়িক পড়ে গেল। সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে পার্টিও বড় কর্তা সবাই রিলিফ চুরিতে মেতে উঠল। এমনই অবস্থা দাঁড়াল যে শেখ মুজিব নাকি তাঁর বরাদ্দ কম্বলটা পাননি। তিনি নাকি আক্ষেপ করে বলেন ''আমার(রিলিফের) কম্বল কোথায় গেল?'' বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন প্রকৃতপক্ষে রিলিফের কোন দরকার ছিল না। নিজেদের সম্পদ ও জনবল কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল। তখনকার সরকার সেপথে না গিয়ে রিলিফ ও সাহায্যের পথ বেছে নিয়েছিল। অথচ, তখন যদি সরকার বিদেশ থেকে রিলিফ ও সাহায্যের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে আমাদের নিজস্ব সম্পদ এবং বিশাল জনবলকে কাজে লাগাতো তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো। জাতি হিসাবে আমরা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হতাম। কিন্তু, তখনকার সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কর্তা ব্যক্তিদের রিলিফ ও সাহায্য চেটেপুটে খেয়ে নিজেদের পেট মোটা করেছিল। জনগণের প্রয়োজনের কথা ভেবে রিলিফ ও সাহায্য চাওয়া হয়নি। জনগণ ছিল অসিলা। অতএব, দেশের জনগণের খাসালত নষ্ট করেছে তখনকার সরকার এবং ক্ষমতাসীন দল। তাদের লজ্জাকর ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সময়। ভোট পাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ থেকে প্রচার করা হলো শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে ভোট না দিলে রিলিফ ও সাহায্য পাওয়া যাবে না। এভাবে এদেশের মানুষের খাসালত নষ্ট করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের পরে যেসব সরকার ক্ষমত্ায় এসেছে তারাও দেশটাকে সাহায্য ও রিলিফের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল। বিদেশ থেকে কিপরিমাণ সাহায্য বা রিলিফ পাওয়া গেল সেটা দিয়ে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা মাপা হয়। এভাবে শুরু থেকে বাংলাদেশের শাসকরা জনগণকে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়নি। তারা জনগণকে আত্মনির্ভর হওয়ার পরিবর্তে পরনির্ভর হতে শেখায়। কারণ পরনির্ভরশীল মানুষকে শাসন করা সহজ। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়াতে পরিস্থিতি একটুও বদলায়নি। বিদেশী সাহায্য ছাড়া এই সরকারের পক্ষে দেশ চালানো সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের খাসালত খারাপ হয়ে গেছে। কোন কিছু হলেই আমরা রিলিফের আশায় বসে থাকি। সাহায্য চাই। কিন্তু, তিনি যা করছেন সেটাও ভাল খাসালতের দৃষ্টান্ত নয়। প্রধানমন্ত্রী গরিব দুঃখীদের রিলিফ দিচ্ছেন, সেই দৃশ্য তিনি পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে ফলাউ করে প্রচার করেন। এটা কি ভাল-খাসালতের পরিচয়? এই দৃশ্য আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষকে পীড়া দেয়। মানুষ শূন্য থালা হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে আর মন্ত্রীরা তাদের থালায় খিচুড়ি ঢেলে দিচ্ছে, এই দৃশ্য যে কত দৃষ্টিকটু ও গ্লানিকর সেটা যে সরকার বোঝে না এবং সেই দৃশ্য সরকার নিয়ন্ত্রিত টিভিতে প্রচার করে সেই সরকারের খাসালত যে খুবই খারাপ তাতে কোন সন্দেহ নেই। দেশের মানুষকে ভিখারীতে পরিণত করার মধ্যে যে কোন গৌরব নেই সেটা সরকার বোঝে না বলেই এই ধরণের দৃশ্য অহরহ টিভি ও পত্রপত্রিকায় দেখানো হচ্ছে। এসব দেখে দেশের আপামর মানুষ যদি রিলিফ ও সাহায্য নেওয়ার মধ্যে খাসালত খারাপ হওয়ার কিছু না দেখে তাহলে সেই দোষ সরকারের ও প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী যদি জনগণের খাসালত ভাল করতে চান তাহলে তাঁর নিজের ও তাঁর সরকারের খাসালত আগে ভাল করতে হবে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারকে বিদেশ থেকে রিলিফ ও সাহায্য নেওয়া বন্ধ করতে হবে।