১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাক-হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ শহীদ হয়েছেন বহুজন।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও ছাত্রদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে আইয়ূব সরকার প্রবর্তিত অর্ডিন্যান্স বাতিলের জন্য ষাটের দশক থেকে শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ উক্ত অর্ডিন্যান্স বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার-১৯৭৩ জারি করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয় এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অফিসার ছিলেন প্রথম উপাচার্য স্যার ফিলিপ যোসেফ হার্টগ, সি. আই. ই., এম. এ., বি. এস-সি.। মি. হার্টগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার পূর্বে ছিলেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার ছিলেন জনাব খান বাহাদুর নাজিরউদ্দিন আহমেদ। নাজিরউদ্দিন আহমেদের ছেলে জনাব নূরউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬তম রেজিস্ট্রার। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমদিকের কয়েকজন প্রফেসরের নাম: (১) অধ্যাপক জি. এইচ. ল্যাংলি, দর্শন বিভাগ (২) অধ্যাপক ড. এস. জি. পেনানদিকর, অর্থনীতি ও রাজনীতি বিভাগ (৩) অধ্যাপক ড. ডবিস্নউ. এ. জেনকিন্স, পদার্থিবদ্যা বিভাগ (৪) অধ্যাপক বি. এম. সেন, গণিত বিভাগ ও (৫) অধ্যাপক (জে. সি. ঘোষ) জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, রসায়ন বিভাগ। অধ্যাপক জি. এইচ. ল্যাংলি ছিলেন দ্বিতীয় উপাচার্য এবং অধ্যাপক ড. ডবিস্নউ. এ. জেনকিন্স ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম উপাচার্য।
১৯২১ সালের ১ জুলাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর ১৯২৩ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম যারা পোষ্ট-র্গযাজুয়েট ডিগ্রী লাভ করেন এবং তাঁদের প্রত্যেককে ৩২/-টাকা করে বৃটিশ-ইন্ডিয়া সরকার বৃত্তি দেন। নিম্নে তাঁদের ১১ জনের নামগুলো দেয়া হলো:
| শ্রী দিনেশ চন্দ্র দত্ত | জগন্নাথ হল |
| শ্রী যতীরময় সেন | জগন্নাথ হল |
| শ্রী অশ্বনী কুমার গুহ | জগন্নাথ হল |
| শ্রী চন্দ্র কুমার ধর | জগন্নাথ হল |
| শ্রী প্রশান্ত কুমার দাস | জগন্নাথ হল |
| শ্রী বসন্ত কুমার বন্দোপ্যাধায় | ঢাকা হল |
| শ্রী মনিন্দ্র নাথ মিত্র | ঢাকা হল |
| জনাব আবদুল হাকিম | মুসলিম হল |
| জনাব মিজানুর রহমান | মুসলিম হল |
| জনাব মমতাজউদ্দিন | মুসলিম হল |
| জনাব জাকের হোসেন | মুসলিম হল |
জনাব মিজানুর রহমানের জন্ম বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মরিচাকান্দি গ্রামের সরকারবাড়িতে-১৮৯৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ঢাকায় মৃত্যু-১৫-০৮-১৯৮১ তারিখ। তিনি ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার ''নবীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়'' থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৭ম স্থান অধিকার করেন এবং ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে ১ম ব্যাচে এম. এ. পাশ করেন। তিনি ১৯২৬ সালে লিখিত প্রথম বি. সি. এস. (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বাঙ্গালী মুসলমানের মধ্যে প্রথম ডেপুটী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেন। উনার পূর্বে আরও যাঁরা ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন তাঁদের মধ্যে জনাব শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ও ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ প্রমুখ(তাঁরা সবাই ছিলেন নমিনেটেড)। এর পূর্বে যারা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন মূলতঃ সাব-ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের প্রথম ছাত্রী ছিলেন সিলেট জেলার লীলা নাগ।
আমি মোঃ জাকির হুসেন ওরফে আলমগীর ১৯৬৮ সালের ১ এপ্রিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের গ্রুপ-'এ'তে এবং বর্তমান(শিক্ষা-৩) শাখায় ছূটিজনিত পদে নিম্নমান সহকারী হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১তম উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওসমান গণি ও ৪তম রেজিস্ট্রার ছিলেন জনাব আবদুল হাদী তালুকদার। আমি এক মাস কাজ করার পর আমার চাকুরী শেষ হয়ে যায়। আবার কনট্যাক্ট-এ কাজ করতে থাকি। তারপর ১৯৬৮ সালের ৮ আগষ্ট, মুদ্রাক্ষরিক স্থায়ী পদে নিয়োগ লাভ করি। ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ছিল-৬৯.৫১(উনসত্তর লক্ষ একান্ন হাজার) এবং সংশোধিত বাজেট হয়েছিল-৮০.৯৬(আশি লক্ষ ছিয়ানব্বই হাজার) টাকা আর ১৯৬৮-৬৯ শিক্ষাবর্ষে বাজেট ছিল-৮২.৫০(বিরাশি লক্ষ পঁঞ্চাশ হাজার) টাকা এবং সংশোধিত বাজেট হয়েছিল-১,০৩,৭৫,০০০.০০(এক কোটি তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার) টাকা। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪টি অনুষদ, ৩০টি বিভাগ, ৩টি ইনস্টিটিউট, ৯টি হল ও হোস্টেল, ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায়-৮,৫০০(আট হাজার পাঁচশত), অধিভূক্ত কলেজের সংখ্যা ছিল-৬৮টি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা ছিল প্রায় ৩২৫(তিনশত পঁচিশ) জন (এর মধ্যে অধ্যাপকের সংখ্যা ছিল-৩২ জন), অফিসারের সংখ্যা ছিল ৩৩(তেত্রিশ) জন, তৃতীয় শ্রেণী কর্মচারীর সংখ্যা ছিল-৩০০(তিনশত) জন এবং ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীর সংখ্যা ছিল-৬৭০(ছয়শত সত্তর) জন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষক+অফিসার+তৃতীয় শ্রেণী কর্মচারী+৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীর=মোট সংখ্যা=১,২৯৫ জন। ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে একজন ছাত্র-ছাত্রীর পিছনে পাবলিক মানি করচ হয়েছে-৯৫২/-টাকা। ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ৫টি। (১) ১৯২১ সালের ১ জুলাই, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' (২) ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই, 'রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়' (৩) ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট, 'ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়' (৪) ১৯৬২ সালের ১ জুন, 'ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়' ও (৫) ১৯৬৬ সালের ১ ডিসেম্বর, 'চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠিত হয়। (৬) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা ১৯৬৫ সালে দিলেও প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে এবং ক্লাশ আরম্ভ হয় ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। এদেশে তখন একটিও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।
১৯৬৮ সালে আমাদের অফিস ছিল জগন্নাথ হলে-তখন অফিস সময় ছিল সকাল ১০ ঘটিকা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা এবং শুক্রবার হাফ টাইম অফিস হত। সাপ্তাহিক অফিস ছুটি থাকিত রবিবার দিন। আমি তখন নতুন পল্টন (ইপিআর-এর নাম হয় বিডিআর-এর বর্তমান নাম হয় বিজিবি) পিলখানার তিন নং গেটের কাছে মেসে থাকিতাম। অফিস থেকে দুপুরের খাবার খেতে মেসে আসা হত এবং খাওয়া শেষ হলে আবার অফিসে যেতাম। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, মেস থেকে খেয়ে অফিসে ফেরার সময় দেখি নিউমাকের্টের দক্ষিণ গেটের আগে একটি খোলা জীপ গাড়িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং আরো দেখি ডাকসুর ভিপি জনাব তোফায়েল আহমদ ও আরো পাঁচ-সাতজন লোক গাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ঐ গাড়িতে ওঠে পড়ি এবং তাঁদের সাথে স্স্নোগান দিতে থাকি ১১-দফা জিন্দাবাদ এর মধ্যে একজন লোক দেখি বলে উঠে যে ৬-দফা আর আমরা বলি ১১-দফা তখন একটা ঝগড়া বাদে আমাদের মাঝে এবং সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু বলে যে ৬-দফার মাঝেই ১১-দফা আছে। তখন সবাই চুপ হয়ে যাই। বঙ্গবন্ধু ডাকসুর ভিপি জনাব তোফায়েল আহমদকে স্নেহের চুমু খায়। বঙ্গবন্ধুর গাড়িটা ইডেন কলেজের সামনে দিয়ে পলাশি হয়ে সলিমুল্লাহ হলের সামনে দিয়ে জগন্নাথ হলের গেটে যখন গাড়িটা থামে আমি তখন গাড়ি থেকে নামতে যাব-এমন সময় আমাকে রেজিস্ট্রার অফিসের কিছু লোক দেখে যে, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গাড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। তখন প্রধান সহকারী জনাব আলী আহম্মদ মন্ডল বলে যে-জাকির আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। বাঙালীরা কোনদিন এক হয় না এবং আরো বলে যে বাঙালীরা ব্যাঙের জাতি-ব্যাঙ কোনদিন পাল্লায় মাপা যায় না-মানে বাঙালীরা ব্যাঙ। জনাব আলী আহম্মদ মন্ডলের কথার সাথে সাথে জনাব কাজী ফজলুল করিম বলে যে-ব্যাঙ ছালায় ঢোকাইয়া ছালার মুখ বাইন্দা মাপা যায়। আমি অফিসে ঢুকলে এসব কথা বলে প্রধান সহকারী জনাব আলী আহম্মদ মন্ডল। এখনও কাজী ফজলুল করিম, অবসরপ্রাপ্ত উপ-রেজিস্ট্রার(শিক্ষা-২) বেঁচে আছে-উনার কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি জনগণের সাথে কুশল বিনিময় করতে ঢাকার রাস্তায় বাহির হন। সারা রাস্তায় বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানায় ছাত্র-জনতা। তখনও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ''বঙ্গবন্ধু'' উপাধি দেয়া হয়নি। আমার জানামতে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ডাকসুর ভিপি জনাব তোফায়েল আহমেদ-শেখ মুজিবুর রহমানকে ''বঙ্গবন্ধু'' উপাধী প্রদান করেন। আমাদের অফিস জগন্নাথ হল থেকে ১৯৬৯ সালের ১লা মে, মাসে আসে আজকের ঠিকানায়, প্রশাসনিক ভবন, নীলক্ষেত, রমনা, ঢাকা-১০০০। শুনা কথা ১৯৬৭-৬৮ ও ১৯৬৮-৬৯ অর্থবছরে এ প্রশাসনিক ভবন তৈরি করতে খরচ হয় ১৭(সতের) লাখ টাকা। তখন থেকে উপাচার্য অফিস-এ ভবনে আসে। এর আগে উপাচার্য অফিস ছিল উপাচার্যের বাসার নিচ তলায়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত্রি ১১টা থেকে ২৭ মার্চের সকাল ১০টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাক-বাহিনীর হাতে ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী শহীদ হয়েছেন-১৫০ জন। এরমধ্যে ছাত্র-১০৪ জন, শিক্ষক-১৯ জন (ইংরেজী বিভাগ-২ জন, বাংলা-৩ জন, ইতিহাস-৩ জন, আই.ই.আর.-৩ জন, দর্শন-১, পরিসংখ্যান-১ জন, মৃত্তিকা-১ জন, পদার্থ-১ জন, ভূতত্ত্ব-১ জন, ফলিত পদার্থ-১ জন, গণিত-১ জন, ইউনিভার্সিিট ল্যাবরেটরী স্কুল-১ জন শিক্ষক=মোট-১৯ জন ও কর্মকর্তা-১ জন এবং কর্মচারী-২৬ জন। এছাড়া আরো ৪৫ জন শহীদের নামসহ মোট ১৯৫ জন শহীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হয়। আমার এ বইতে সম্পূর্ণ তালিকা দেয়া গেল না।
১৯৭০ সালে প্রধান সহকারী জনাব আলী আহম্মদ মন্ডল, বি. এ. পরীক্ষা দেয় এবং পাস করে। তারপর সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপিত একটি শূন্য পদে আবেদন করে ''সহকারী রেজিস্ট্রার" পদে নিয়োগ লাভ করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার সময় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে দালালী করেছেন মানে ''মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে" কাজ করেছেন এবং স্বাধীনতার পর ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে কর্মচারীরা অফিসে কাজে যোগদান করতে দেয় না। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পর ১৩তম উপাচার্য হয়ে আসেন অধ্যাপক ড. মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী। তখন উনার সাথে লাইন করে উপাচার্যের সচিব পদে নিয়োগ লাভ করেন। তখন উপাচার্যের সচিব পদে ছিলেন জনাব মুহম্মদ সেলিম। উনাকে ও.এস.ডি. করে-সেই পদে জনাব আলী আহম্মদ মন্ডল যোগদান করেন। জনাব মুহাম্মদ সেলিম, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ হোসেনের সচিব হিসেবে। তখন উপাচার্য সচিবের পদটা ছিল সহকারী রেজিস্ট্রারের পদমর্যাদার সমান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী, অফিসার ও শিক্ষক কাজে যোগদান করেছে শতকরা ৯৯ জন এর উপরে। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের সচিব হিসেবে জনাব আলী আহম্মদ মন্ডল নিয়োগ পাওয়ার পর আমরা তাকে কিছুদিন কাজে যোগদান থেকে বিরত রেখেছিলাম। কারণ জনাব আলী আহম্মদ মন্ডল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কাজ করেছেন বলে। কিছুদিন পর দেখা গেল-আমাদের মাঝে কিছু লোক জনাব আলী আহম্মদের পক্ষে দালালী শুরু করতে লাগল। কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদককে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেয়ারটেকার-এর দায়িত্ব দেয়া হলে-সে আন্দোলনে ছুড়ি মারতে থাকে এবং আরেকজন সভাপতি তাঁকে প্রমোশন দেওয়ার লোভ দেখানো হয়। ১৯৮৮ সালের ৩০ জুন, জনাব আলী আহম্মদ মন্ডল, উপ-রেজিস্ট্রার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন এবং শুনেছি ২০১২ সালে মারা গেছেন।
১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় আমি প্রত্যেকটি মিটিং মিছিলে যোগ দিতাম। আমিও ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে যাই বঙ্গবন্ধুর সভা দেখতে এবং ভাষণ শুনতে। তখন আমার টাইফয়েড জ্বর ছিল। ৮ মার্চ, ১৯৭১ সালে গ্রামের বাড়িতে চলে গেলাম এবং টাইফয়েড জ্বর আরো বেড়ে গেল এবং আমি দুর্বল হয়ে গেলাম। ২৪ মার্চ, ১৯৭১ সালে গ্রাম থেকে আমার এক দুলাভাইকে নিয়ে ঢাকায় আসি জ্বরের চিকিৎসা নিতে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের ডা. কিতাব উদ্দিন সাহেবকে দেখাই ২৫-০৩-১৯৭১ তারিখ এবং উনার ট্রিটমেন্ট অনুযায়ী চলতে থাকি। ২৫ মার্চ, ১৯৭১ সালে বিকেলে জ্বর নিয়ে পল্টন ময়দানে কাজী জাফরের বক্তৃতা শুনতে যাই এবং শুনি। সে বলছে ভ্াষণে যে, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম-ব্যালটে নয় বুলেটে হবে সমাধান। তারপর সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেল-গুলিস্থান সিনেমা হলে একটা বাংলা সিনেমা চলছে ''সুখদুঃখ'' সারাটা সিনেমায় দুঃখটা বেশি সময় দেখানো হল আর সুখটা কম সময় দেখানো হল। রাত ৯টা বেজে গেল-রাস্তায় বাস-রিকশা কিছুই পাইনি। গুলিস্থান থেকে হেঁটে হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে যখন আসি-আমি এবং আমার দুলাভাই তখন দেখি রাস্তায় বেরিকেট দেওয়া শুরু হয়ে গেছে ছাত্র-জনতার। আমি তখন থাকি পিলখানার তিন নম্বর গেটের সাথে মেসে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, রমনা রেস কোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক ভাষন দেন। ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ, শেষবারের মতো ঢাকা সফরে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ, পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনা বৈঠক শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ, পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনা। ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে প্রায় সোয়া দু'ঘন্টাব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ, ছিল এক বিভ্রান্তিপূর্ণ দিন। প্রেসিডেন্ট হাউজে ভুট্টোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার ছিল ২২ মার্চের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, পূর্ব-পাকিস্তানে গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে আকস্মিকভাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান করাচির পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। পাক-বাহিনী রাতে ঢাকায় শুরু করে ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বেরাচিত হত্যাকান্ড 'অপারেশন সার্চলাইট' নিরস্ত্র জনগণের উপর অমানসিক নির্যাতন শুরু। -টেলিগ্রাম পত্রিকায়-প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলে গেছে সব দাবি মানা হয়ে গেছে এখন আপনারা হরতাল, অবরোধ তুলে ফেলুন। আসলে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে চলে গেছেন ওরা। পাক-বাহিনী রাতে ১১টার পর ঢাকায় শুরু করে ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বেরাচিত হত্যাকান্ড 'অপারেশন সার্চলাইট' নিরস্ত্র জনগণের উপর অমানসিক নির্যাতন শুরু। ২৫ মার্চ, ১৯৭১ রাত্রি ১১টা থেকে ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সালের সকাল দশটা পর্যন্ত। পিলখানার ভিতরে পাঞ্জাবী অফিসাররা বাঙালী ইপিআরকে বলেছে যে, আপনাদের সব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। আপনারা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সবাই অস্ত্র সমর্পণ করেন। যারা অস্ত্র জমা দিয়েছে তারাই মারা গেছেন। যারা অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেয়নি তারা কোনরকমে জান নিয়ে পিলখানার বাহিরে আসতে পেরেছে। কারণ অনেক ইপিআর পিলখানা থেকে ফাইট করতে করতে মার খেয়ে আমাদের মেসে আশ্রয় নেয় রাত্রে-সকাল হবার পূর্বেই ইপিআরগুলো চলে যায়। ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে সকাল দশটা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ বিরতি দিয়েছিল দুই ঘন্টার জন্য। তখন আমরা যারা ছিলাম ঢাকাতে সবাই কাফেলারমত মানুষ যাচ্ছে গ্রামের বাড়িতে। তখন দেখি নীলক্ষেত বস্তীতে ও সারা নীলক্ষেতে অনেক মানুষ মারা গেছে। তারপর সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে যাই এবং অনেক ছাত্র, পুলিশ ও জনতার লাশ দেখতে পাই। তারপর সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের পাশ দিয়ে হেঁটে গুলিস্থান যাই এবং রেল-লাইনে মানুষ আর মানুষের লাশ দেখেছি। গুলিস্থান থেকে হেঁটে ডেমরা যাই এবং অনেক লাশ আর লাশ। ডেমরা, তারাবো দিয়ে নদী পার হওয়ার পর আবার স্বাধীন মনে হল নিজেকে-এখানে মানুষ মানুষের প্রতি অনেক ভালবাসা দিখিয়েছে এবং আমরা নরসিংদী যাব তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজে-তখনও আমার শরীরে জ্বর আছে। পরিবহন কম থাকায় শারিরিকভাবে যারা দুর্বল তাদেরকে আগে যেতে দিল। নরসিংদী যাওয়ার পর আবার শুনি যে, পাঞ্জাবী আর্মিরা নরসিংদী আসিতেছে-আমরা কিছু খাওয়া-দাওয়া করার পর নদীর ঘাটে গেলাম এবং কোন কিছু পেলাম না। সারারাত নদীর ঘাটে বসে বসে অনেক মানুষ রাত কাটালাম এবং সকালে নৌকা দিয়ে মেঘনা পার হলাম এবং সকাল দশটার সময় বাড়িতে গেলাম এবং আমার শরীরের জ্বর ভাল হয়ে গেল। বাড়ির সবাই মনে করেছিল আমরা মারা গেছি-কারণ পিলখানার কাছে থাকতাম বলে।