২৭-০৬-২০০৮ তারিখের প্রথম আলোর রিপোর্টঃ বিশ্বের সবচেয়ে দামি বাড়ি! ডলারে ১০০ কোটি-পাক্কা এক বিলিয়ন(তবে ফোর্বস সাময়িকীর মতে জমিসহ খরচ দাঁড়াবে ২০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি)। মুম্বাইয়ে নির্মাণাধীন বাড়িটির কাজ শেষ হলে এটাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাড়ি। বাড়িটার মালিক বিশ্বের পাঁচ নম্বর ধনী, ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি। পৃথিবীর ব্যয়বহুল বাড়িটি মুকেশ কেন তৈরী করছেন, জানেন? স্ত্রী নীতার ৪৫তম জন্মবার্ষিকীতে উপহার দেওয়ার জন্য। গত বছর ৪৪তম জন্মবার্ষিকীতে উপহার দিয়েছিলেন গোটা একটা বিমান। ২৭ তলার আকাশচুম্বী বাড়ি ''ভিলা আন্তিলা''। তবে উচ্চতায় সাড়ে পাঁচ'শ ফুট। প্রচলিত মাপে ৬০ তলা দালানের সমান। চার হাজার ৫৩২ বর্গিমটারের জমিতে গড়ে উঠছে এ বাড়ি। জমির প্রতি বর্গফুটের বর্তমান দর ৭৫ হাজার রুপি। আলটামাউন্ট সড়কে তৈরি হচ্ছে এ বাড়ি। মুম্বাই শহরের বনেদি আর ব্যস্ত এলাকায় এ আলটামাউন্ট রোড। শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে শেষ হবে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে। এ বাড়িতে থাকবে ছয়জন বাসিন্দা। বাড়ি আর তাঁদের দেখবাল করার জন্য ৬০০ কর্মী। এ বাড়িতে এলিভেটর থাকছে নয়টা। ছাদে তিনটি হেলিপ্যাডও তৈরী করা হচ্ছে। বাড়ির কোনো কক্ষ অপর কক্ষের সঙ্গে মিলবে না। দৃষ্টিসীমার একদিকে থাকবে আরব সাগর, আরেক দিকজুড়ে মুম্বাইয়ের দিগন্ত রেখা। এর নিচের চার তলার পুরোটায় থাকবে খোলা বাগান। এ বাগান তৈরী হচ্ছে ব্যাবিলনের শূন্যোদান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। ১৬৮টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা। এ ২০০ কোটি ডলার দিয়ে বাংলাদেশের মত দেশে ৪,৬৬,৬৬৭(চার লক্ষ সিষট্টি হাজার ছয়শত সাষট্টি)টি পরিবারের স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান করা যেতো। বর্তমানে মুকেশ ২২তলা বাড়িতে থাকেন। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সম্রাট শাহজাহানের কথা মনে পড়ছে। স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর তিনি তৈরি করেছিলেন পৃথিবীর আশ্চর্য এক স্থাপত্যকর্ম, তাজমহল। আর এ যুগের মুকেশ আম্বানি জীবিত অবস্থায়ই স্ত্রীকে দিয়েছেন গোটা একটা উড়োজাহাজ, আর দিতে যাচ্ছেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বাড়ি।
আবার বিগত ১০০(একশত) বছরে উৎপাদন বেড়েছে ১৭ গুণ। আর গত ১০০(একশত) বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ৪ গুণেরও কম। গত ১৯০১ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্তকে বলা হয়েছে। তা'হলে পর্বত চুড়ান্ত উৎপাদন কোথায় যায়? হাতে গোনা কতিপয় মানব সন্তানের কাছেই কি? ওদের দ্বারাই চিরকাল সমস্ত উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হবে? এযাবৎকালের ইতিহাসই শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস? আদিম সাম্যবাদী সমাজ ছাড়া। আদিম সাম্যবাদী সমাজে শোষণ ছিল না। দুনিয়ার সব মানুষের সমৃদ্ধি আর যৌথ আবেগ/প্রেম/স্নেহ/মায়া মমতার সামাজিক বিকাশ কি কোন দিনই হবেনা?
শ্রমজীবী মানুষ বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারলেই হবে।
যে বিজ্ঞানের বদৌলতে এ অসহনীয় বৈষম্য তা কতটা বিজ্ঞানসম্মত আর কতটা আধিপত্যবাদ? এ আধিপত্যবাদ অধিকাংশ রাষ্ট্রকে করেছে গ্লোবাল নাচের পুতুল। তা'হলে কি রাষ্ট্র নামক এ কাঠামো ভাঙ্গার প্রয়োজন নেই? এ বিদ্যমান রাষ্ট্রটি, আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পদ্ধতি আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত বিকাশের নিশ্চয়তা দেয় কতটুকু?
আবার বলা হচ্ছে বিজ্ঞান হলো বিশেষ জ্ঞান। বিজ্ঞান কাকে বলে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বিজ্ঞান বলে। আর এ বিশেষ জ্ঞানের অনুশীলন হল সামাজিক গঠনাবলী ও প্রাকৃতিক নিয়মাবলীতে সু-সংগঠিত যুক্তি আর পর্যেবক্ষণের স্বচ্ছ কর্ম দ্বারা। তা'হলে কি সব জ্ঞানই বিজ্ঞান নয়? আমরা কোনটি জ্ঞান আর কোনটি বিশেষ জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করব? সুতরাং স্পষ্ট বলা যায় বিজ্ঞান আর সমাজের সাধারণ মানুষের মাঝে অবস্থান করে না। পাশাপাশি সমাজ আর প্রকৃতি পর্যেবক্ষণলব্ধ যুক্তি চর্চার অধিকারও চলে যায় ঐ বিশেষ মানুষের নিয়ন্ত্রণে। অথচ মানুষের ইতিহাস পর্যােলাচনা করলে আমরা জানি-সংগ্রহশীল কিংবা শিকার ভিত্তিক সমাজের যৌথ প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে তাদের জীবন-যাপন অগ্রসরতা পেয়েছিল। সম্পূর্ণ বৈষয়িক ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থাবলীর উপর গড়ে উঠছে তাদের শ্রমক্ষেত্র ও চিন্তার পদ্ধতি। অরণ্যচারী গুহাবাসী মানুষ তার অর্জিত অভিজ্ঞতাকে ক্রমান্বয়ে সঞ্চারিত করেছে নিরন্তন গোষ্ঠীলব্ধ প্রতিরোধী শক্তির অনন্যতায়। তা'হলে মানব-সমাজ বিকাশের কোন পর্যােয় অর্জিত সেই গোষ্ঠীবদ্ধ সার্বজনিন জ্ঞান খন্ড খন্ড বিশেষ জ্ঞানে রূপ নিল? ইতিহাসের গতি পথে কখন তা মানুষের চিন্তা জগতে এসেছে? কিংবা মানুষ অর্থৈনতিকভাবে খন্ড খন্ড শ্রেণীতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণেই কি বিশেষ জ্ঞান হিসেবে বিজ্ঞান বিশেষ শ্রেণীর ক্ষমতার কৌশল উপকরণে পরিণত হয়নি? আজকের পাশ্চাত্য দর্শন কিভাবে কখন আধিপত্যবাদী চরিত্রের হয়ে উঠল? আমাদের বাংলা অঞ্চলে কি কোন বিজ্ঞান দর্শন, জিজ্ঞাসা ছিল না? আমাদের বিজ্ঞান দর্শন আজ কোথায়? জিজ্ঞাসাগুলো কেন হারিয়ে গেল? আসলে আমাদের জিজ্ঞাসাগুলোই বা নিয়ন্ত্রণ করে কারা? আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বিজ্ঞান ছিল না? বিজ্ঞান কি শুধু গবেষণাগারের ব্যাপার? এটা কি কেবল ধনীদের বিলাসের বস্তু বা অস্তিত্ব? শ্রমজীবী মানুষের কি কোন উপকারে আসে? মানবতার বিকাশে এ বিজ্ঞান কতটুকু সহায়ক?
আসুন এ প্রশ্ন উত্থাপন করি আমাদের শ্রমের মধ্যে, আমাদের চিন্তার মধ্যে। আমাদের যৌথ আর সামাজিক বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ হউক আমার/আপনার বিজ্ঞান চিন্তা। বিকশিত হউক মানবিক সাম্যের এসব দ্বান্দ্বিক প্রশ্নোত্তরের রূপায়ন আমাদের মাঝে বিজ্ঞান চেতনা বাড়িয়ে তোলে। বস্তুর প্রতিনিয়ত বিকাশ হচ্ছে। সমাজের নিয়ম হলো উৎপাদন এবং পুনঃউৎপাদন। চিরন্তন বলে কিছুই নেই। সব কিছুই পরিবর্তনশীল। আমাদের দেশের সম্পদের অপচয়, সমাজের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, দুর্নীিত, স্বজনপ্রীতি, অব্যবস্থা এবং অনৈতিক কাজ বন্ধ করতে হবে নতুবা ততদিন বাংলাদেশের বেকারত্ব ও দারিদ্র দূর হবে না। বেকারত্ব ও দারিদ্র দূর করতে হলে-সম্পদের অপচয় রোধ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, দুর্নীিত, স্বজনপ্রীতি, অব্যবস্থা ও অনৈতিক কাজ বন্ধ করতে হবে নতুবা বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রকৃত উন্নয়ন মানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার গ্যারান্টি সবার জন্য করতে হবে। তখনই বাংলাদেশ হবে প্রকৃতপক্ষে ''সোনার বাংলা''। নতুবা সবই কথার কথা ও ফাঁকাবুলি ছাড়া আর কিছু নয়। মোঃ জাকির হুসেন(আলমগীর)
'আহমদপুর চৌধুরীবাড়ির বংশ পরিচিতি ও চৌধুরী শামসুন নাহার বেগমের আত্মীয়-স্বজন' গ্রন্থ সম্বন্ধে দু'টি কথা=আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া:
খ্রিস্টীয় আঠার শতকের একেবারে শুরুর দিকেই বাঙলার দিওয়ান মুর্শিদ কুলি জ'াফর খান ঢাকা থেকে দিওয়ানি দফতর সরিয়ে নিলেন মুর্শিদাবাদে। আর তখন থেকেই হল রাজধানী ঢাকা নগরের অধঃপতনের সূচনা। রাজস্ব দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবাই দল বেঁধে চলে গেলেন মুর্শিদাবাদে। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদ কুলি খানের সুবেদারি লাভের সঙ্গে সঙ্গে সুবেদারের দফতরও চলে গেল মুর্শিদাবাদে। ঢাকা নগরের অধঃপতন প্রায় পূর্ণ হতে চলল। ঢাকার নায়েব-ই-নাযিমের দফতরের জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য কয়েকজন ছাড়া বাকি সব কর্মকর্তা-কর্মচারি চলে গেলেন সুবার নতুন রাজধানী মুর্শিদাবাদে।
১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজ শাসনামলে ঢাকার অধঃপতন হল ষোল কলায় পূর্ণ বিশেষ করে ১৭৬৫ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বাঙলার দিওয়ানি লাভের পর থেকে। নামকাওয়াস্তে নবাব উপাধিধারী একজন নায়েব-ই-নাযিম ঢাকাতে রাখা হল বটে তবে তাঁর অবস্থা হল ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দােরর মতো। মাইনাটা মোটাই বলা চলে। তবে কাজ বলতে তেমন কিছুই নেই, তার চেয়েও কম তার ক্ষমতা।
রাজধানী মুর্শিদাবাদে চলে যাওয়ার পরেও মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তা মাটি কামড়ে এখানে পড়েছিলেন নানাকারণে। আরো রয়ে গিয়েছিলেন বণিকসহ অভিজাত সমাজের কিছু লোকও। এদের মধ্যে অধিকাংশই, প্রায় সবাই গেলেও ভুল হবেনা, ছিলেন বহিরাগত অর্থাৎ ইরান, তুরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশ থেকে আগত ভাগ্যান্বেষী মুসলমান। তখনকার দিনে সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তােদর মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন উপরে উল্লিখিত দেশসমূহ থেকে আগত লোক এবং সেই সাথে আরব ও ইরাক থেকে আগত মির, শেখ প্রভৃতি উপাধিধারী কিছু কিছু লোকও। ইংরেজ অধিকারের পরে ঢাকায় অবস্থানরত এ সমস্ত লোক জীবন-জীবিকার অন্বেষণে প্রায় দিশেহারা হয়ে বাঙলার পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতে থাকেন।
তখন ছিল ভুমি ভিত্তিক অর্থনীতির যুগ। সেই সময়ে বর্তমান কালের বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলাদুটিতে অনেক নতুন ভূমি জেগে উঠেছে নদীতে চর সৃষ্টির ফলে। ঢাকার বেশ কাছাকাছি স্থানে অবস্থিত বলে সেখানে বিশেষ করে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলাতে এসব বহিরাগতদের অনেকেই ছুটে যান।
তখনকার দিনে বর্তমান কালের কুমিল্লা শহর থেকে আরম্ভ করে বর্তমান কালের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর পর্যন্ত প্রায় সমগ্র অঞ্চল ছিল সুবিখ্যাত বাখরখানি রুটির প্রবর্তক জ্যেষ্ঠ আকা বাকেরের প্রপৌত্র আকা সাদেকের বংশধরদের জমিদারি। প্রকৃতপক্ষে পাটিকারা পরগনার জমিদার ছিলেন আকা সাদেকের দ্বিতীয় পুত্র মির্যা আবুল হোসেন ওরফে আকানবী, গঙ্গামন্ডল পরগনার জমিদার ছিলেন আকা সাদেকের তৃতীয় পুত্র এবং বলদাখাল নামক বিরাট পরগনার অর্ধাংশের জমিদার ছিলেন আকা সাদেকের জ্যেষ্ঠ পুত্র মির্যা ইবরাহিম বেগের জ্যেষ্ঠ কন্যার স্বামী মির আশরাফ আলী খান। আকা বাকের-আকা সাদেকের বংশধররা জাতিতে তুর্কি হলেও মির আশরাফ আলী খান ছিলেন ইরানের সিরাজনগরের অভিজাত বংশীয় একজন সৈয়দ এবং ঢাকার ধনাঢ্য একজন বনিক। ঢাকা নগরে প্রাসাদসম অট্রালিকা থাকলেও কুমিল্লা জেলার থোল্লা গ্রামের প্রাসাদ থেকেই তিনি বেশিরভাগ সময় জমিদারি পরিচালনা করতেন।
ইংরেজদের দলিলপত্র থেকে জানা যায় যে, অন্তত ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত মির্যা ইবরাহিম বেগ বলদাখাল পরগনার জমিদার ছিলেন। এর অল্প কিছু কাল পরেই খুব সম্ভবত অপুত্রক বৃদ্ধ জমিদারের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন বড় কন্যার স্বামী মির আশরাফ আলী খান।
আর প্রায় সমসময়েই দেখা যায় যে, বলদাখাল, গঙ্গামন্ডল ও কাছাকাছিস্থানের অন্ততঃ দশটি গ্রামে এমন সব ভাগ্যান্বেষী ও অভিজাত বংশীয় বহিরাগতদের আগমণ ঘটেছিল যাঁদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন জাতিতে ইরানি, তুর্কি অথবা তুরানি। তাদের ব্যাপারে বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য একটি বিষয় ছিল এই যে, নতুন স্থানে আগমণের পরে তাঁরা বেশি কম এমনসব ভূমির অধিকারী হয়েছিলেন যাতে জীবন-জীবিকার ব্যাপারে তাঁরা সচ্ছলতা লাভ করেছিলেন এবং অভিজাত বহিরাগত হিসাবে তাঁরা তাঁদের স্বাতন্র্তয ভিত্তিক আভিজাত্য বজায় রেখেছিলেন বহুদিন ধরে।
তাঁদের সম্পর্কে আর একটি লক্ষনীয় বৈশিষ্ট হল এই যে, এই বহিরাগতদের মধ্যে প্রায় সবাই একাধিক ভাই মিলে এই অঞ্চলে এসেছিলেন এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভাইদের নাম সহজে পাওয়া গেলেও তাঁদের পিতার নাম খুব সহজে পাওয়া যায়নি। এর কারণ ছিল খুব সম্ভবতঃ এই যে, পিতা মহোদয়টি বোধ হয় জীবিত ছিলেন না অথবা জীবিত থাকলেও খুব সম্ভবতঃ পিতাদের পক্ষে এই অঞ্চলে সশরীরে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি।
এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, এই অঞ্চলে আগমণকারী দলটির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন তদানীন্তন বলদাখাল পরগনা ও বর্তমানে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার অধীনস্থ ভেলানগর গ্রামে আগমণকারী জনাব খোশাল দিওয়ান ও তাঁর ভাইগণ সর্ব জনাব আকিল মাহ্মুদ, আকরাম-উদ-দীন মুনশি ও হোসায়েন উদ-দীন মুনশি(মুন্সেফ)। আমাদের পরিবারের সঙ্গে খোশাল দিওয়ানসহ তাঁদের তিন পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্ক থাকলেও তাঁদের পিতার নামটি উদ্ধার করা আমার পক্ষেও সম্ভব হয়নি। খোশাল দিওয়ান নিজে বালদাখাল পরগনার দিওয়ান, তাঁর তৃতীয় ভাই আকরাম-উদ-দীন মুনশি হন একটা যোওয়ার -এর ইজারাদার এবং চতুর্থ ভাই হন মুন্সেফ। আঠার বিঘার বসতভাটিসহ তাঁরা প্রচুর ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হন।
একই সময়ে আযম শরীফ, মোয়াযযম শরীফ ও শরীফ আলী ভূঁইয়া নামক তিনভাই বলদাখাল পরগনার যথাক্রমে দরিয়াদৌলত গ্রাম, রূপসদী গ্রাম ও পেয়ারাকান্দি গ্রামে বসতি স্থাপন করেন এবং প্রচুর ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হন। তাঁদের পিতার নামটিও উদ্ধার করা যায়নি।
প্রায় একই সময়ে বলদাখাল পরগনা ও বর্তমান বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফরদাবাদ গ্রামে তিনভাই আসেন এবং তিনটি মুনশি বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। দুঃখের সাথে বলতে হয় তাঁদের পরবর্তী বংশধরদের নাম পাওয়া গেলেও তাঁদের পিতাসহ তাঁদের তিন ভাইয়ের নাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় একই সময়ে রূপসদী থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে-পশ্চিম কোণে বর্তমানে হোমনা উপজেলার অধীনস্থ দৌলতপুর গ্রামে আসেন দৌলত শিকদার নামক একজন অভিজাত বংশীয় ব্যক্তি তাঁর ভাইকে নিয়ে এবং প্রচুর ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হয়ে নিজের নামানুসারে সেই গ্রামের নাম রাখেন দৌলতপুর। তাঁদের পিতার নামটিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় একই সময়ে বলদাখাল পরগণা ও নবীনগর উপজেলার অধীনস্থ মেঘনা নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন নাসির খান নাম এক রইস এবং প্রচুর ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হয়ে এই গ্রামের নাম রাখেন নাসিরাবাদ। তাঁর পিতার নামও জানা যায়নি। পরবর্তীকালে নাসির খানের পরিবারের একজন রসুল্লাবাদ গ্রামে চলে যান এবং রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।
এর আগেই সেই রসুল্লাবাদ গ্রামেই খোন্দকার বাড়ি(খনকার বাড়ি) একটি অভিজাত পরিবারের নিবাস রসুল্লাবাদ গ্রামে ছিল। সেই অভিজাত খোন্দকার পরিবারও আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছিল বলে তাঁদের পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়।
পলাশী যুদ্ধের পরে বা তার কিছু আগে বলদাখাল পরগনা ও বর্তমান মুরাদনগর উপজেলার অধীনস্থ কামাল্লা গ্রামে ঢাকা থেকে একটি অভিজাত মুসলিম পরিবারের আগমন ও বসতি স্থাপনের ঘটনা ঘটে। সেই অভিজাত বংশীয় ভদ্রলোক বলদাখাল পরগনার একটি তালুকের মালিক হন এবং তিনিই হন কামাল্লা গ্রামের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু চৌধুরী পরিবারের সেই আদি পুরুষটির নাম পাওয়া যায়নি।
কামাল্লা চৌধুরী পরিবারের প্রায় সমসময়ে বলদাখাল পরগণার অধীনস্থ বর্তমান মুরাদনগর উপজেলা সদরে তকী কাযী নামক এক অভিজাত বংশীয় কাযী সাহেব এসে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন মুরাদনগরের সুবিখ্যাত কাযী বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা।
আঠার শতকে নাসির-উদ-দীন মুনশি জনৈক তুর্কি বা ইরানি ভদ্রলোক ছিলেন ঢাকার নায়েব-ই-নাযিম-এর মুনশি। তিনি তাঁর সাত ছেলেকে যুগোপযোগী শিক্ষাদান করেন। তাঁর বড় ছেলে শমশির-উদ-দীন মুনশি ও তাঁর ছোট ভাই বাহরাম মুনশি ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন এবং ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে মুন্সেফের চাকুরী লাভ করেন। কালক্রমে বলদাখালের জমিদার মির আশরাফ আলী খান সাহেবের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা হয়। মির সাহেব তাঁকে একটি বড় তালুক, ২২ দ্রোণ(৩৫২ বিঘা) লাখেরাজ ভূমি ও দিঘিরপাড় গ্রামে অবস্থিত ২৮৮ বিঘা আয়তনের দিঘির অর্ধেকটা এবং বসত বাড়ির জন্য প্রচুর জমি দান করলে শমশের-উদ-দীন মুনশি দিঘীরপাড় গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর আর দুই ভাই কেরানিগঞ্জ উপজেলার কলাতিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। কলাতিয়া মিঞা বাড়ির অধিবাসীগণ তাঁদের বংশধর। নাসির-উদ-দীন মুনশির বাকি তিন পুত্রের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
আঠার শতকের সেই ক্রান্তিলগ্নে খান মাহমুদ চৌধুরী ও সালেহ আহমদ চৌধুরী নামক দুই ভাই তদানীন্তন গঙ্গামন্ডল পরগনা ও বর্তমান কালের দেবীদ্বার নামক উপজেলার পইরাংকুল নামক স্থানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের পিতার নামটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি-পরে উদ্ধার করা হয়েছে (পিতার নাম-গাযী আহমদ)। তবে তাঁরা যে অভিজাত বংশীয় ছিলেন সেই প্রমাণ পাওয়া যায় পরবর্তীকালে তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কের দৃষ্টান্তগুলি থেকেই।