বাজেট উত্থাপন করা হয় ইংল্যান্ডে১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন১৮৬০ সালে ভারতের

।ভাইসরয়ের নির্বাহী পরিষদের সদস্য স্যার জেমস উইলসন্স পার্লােমন্টে প্রথম আসন্ন অর্থ-বছরের জন্য বাজেট তুলে।

ধরেনসেই থেকে এ জনপদে বাজেটের প্রচলন শুরু

।গত ৩২(বত্রিশ) বছরে দেশে রাজস্ব ব্যয় হয়েছে-২,৫৬,৬৮৮.১৮(দুই লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার অষ্টআশি) কোটি (আঠার লক্ষ)।

টাকাএ রাজস্ব বাজেটের ৩২% (৮২,১৪০.২২) বিরাশি হাজার একশত চল্লিশ কোটি এবং বাইশ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে
দেশের সরকারি, আধা-সরকারি এবং সায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশনবাবদ

।রাজস্ব ব্যয়ের ২১% (৫৩,৯০৪.৫২) তিপান্ন হাজার নয়শত চার কোটি এবং বায়ান্ন লক্ষ টাকা বিদেশী ঋণের আসল এবং।

সুদবাবদ খরচ হয়েছেএ বাজেটের পণ্য-সেবা-১৪%, সাহায্য মঞ্জুরী-১৫%, ভর্তূিক-৪%, সম্পদ সংগ্রহ-৪%, অনুন্নয়ন

।মূলধন ব্যয়-৫% ও অন্যান্য ব্যয়-৫%, মোট ব্যয়-৪৭% (১,২০,৬৪৩.৪৪) এক লক্ষ বিশ হাজার ছয়শত তেতাল্লিশ কোটি এবং।

চুয়াল্লিশ লক্ষ টাকা

গত ৩৯ বছরে(এডিপি)ও আকার বেড়ে প্রায় ৩৮,৫০০(আটত্রিশ হাজার পাঁচশত) কোটি টাকা। ১৯৭২ থেকে ২০১১-১২ তারিখ পর্যন্ত এডিপির ব্যয়ঃ

।।

গত ৩৯ বছরে(এডিপি)ও আকার বেড়ে প্রায় ৩৮,৫০০(আটত্রিশ হাজার পাঁচশত) কোটি টাকা১৯৭২ থেে ২০১৪-১৫ তারিখ

।পর্যন্ত এডিপির ব্যয়ঃ।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি(এডিপি) কোটি টাকায়
ক্রমিকঅর্থ বছরমূল এডিপিসংশোধিতপ্রকৃতশতকরা হার
এডিপি(কোটি)বাস্তবায়ন
১৯৭১-৭২১৫৮.৭৭
১৯৭২-৭৩৫০০.৯৮২৮১৫৬%
১৯৭৩-৭৪৫২৫৪০০৭৬%
১৯৭৪-৭৫৫২৫৪৯৪৯৪%
১৯৭৫-৭৬৯৫০৮১৩৮৫%
১৯৭৬-৭৭১,১৪০১০০৬৯৯৯৯৯%
১৯৭৭-৭৮১,২০৩১২৫৭১০৪%
১৯৭৮-৭৯১,৬০৩১৪৮৩৯৩%
১৯৭৯-৮০২,৩৩০২০৮২৮৯%
১৯৮০-৮১২,৩৬৯২৩৬৪১০০%
১৯৮১-৮২২,৭১৫২৩৯১৮৮%
১৯৮২-৮৩৩,১২৬৩১২৬৮৬%
১৯৮৩-৮৪৩,৫৮৫৩০০৬৮৪%
১৯৮৪-৮৫৩,৪৯৮৩১৬৭৯১%
১৯৮৫-৮৬৪,০৯৬৩৬২৮৮৯%
১৯৮৬-৮৭৪,৭৬৪৪৫১৩৪৪৩৯৯৮%
১৯৮৭-৮৮৪,৬৫১৪১৫০৮৯%
১৯৮৮-৮৯৫,৩১৫৪৫৯৬৪৬২২১০১%
১৯৮৯-৯০৫,৮০৩৫১০৩৫৭১৭১১২%
১৯৯০-৯১৬,১২৬৫২৬৯৮৬%
১৯৯১-৯২৭,৫০০৭,১৫০৬,০২৪৮৪%
১৯৯২-৯৩৮,৬৫০৮,১২১৬৫৫০৮১%
১৯৯৩-৯৪৯,৭৫০৯,৬০০৮,৯৮৩৯৪%
১৯৯৪-৯৫১১,০০০১১,১৫০১০,৩০৩৯২%
১৯৯৫-৯৬১২,১০০১০,৪৪৭১০,০১৬৯৬%
১৯৯৬-৯৭১২,৫০০১১,৭০০১১,০৪১৯৪%
১৯৯৭-৯৮১২,৮০০১২,২০০১১,০৩০৯০%
১৯৯৮-৯৯১৩,৬০০১৪,০০০১২,৫০৯৮৯%
১৯৯৯-২০০০১৫,৫০০১৬,৫০০১৫,৪৭১৯৪%
২০০০-২০০১১৭,৫০০১৮,২০০১৬,১৫১৮৯%
২০০১-২০০২১৯,০০০১৬,০০০১৪,০৯০৮৮%
২০০২-২০০৩১৯,২০০১৭,১০০১৫,৪৩৪৯০%
২০০৩-২০০৪২০,৩০০১৯,০০০১৬,৮১৭৮৯%
২০০৪-২০০৫২২,০০০২০,৫০০১৮,৭৭১৯১%
২০০৫-২০০৬২৪,৫০০২১,৫০০১৯,৪৭২৯১%
২০০৬-২০০৭২৬,০০০২১,৬০০১৭,৯১৬৮৩%
২০০৭-২০০৮২৬,৫০০২২,৫০০১৮,৪৫৫৮৩%
২০০৮-২০০৯২৫,৬০০২৩,০০০১৯,৭০১৮৬%
২০০৯-২০১০৩০,৫০০২৮,৫০০২৫,৯১৭৯১%
২০১০-২০১১৩৮,৫০০৩৫,৮০০৩৩,০০৭৯২%
২০১১-২০১২৪৬,০০০৪১,০০০৩৮,০২৩৯৩%
২০১২-২০১৩৫৫,০০০৫২,৩৬৬৪৭,৮৬৩৯১%
২০১৩-২০১৪৬৫,৮৭০৬০,০০০৫৫,০০০৯১.৬৭%
২০১৪-২০১৫৮০,৩১৫৭৭,৮৩৬৭১,০৭৯৯১%
২০১৫-২০১৬৯৭,০০০৯৩,৮৯৫-১০ মাসে ৫০%
২০১৬-২০১৭১,১০,৭০০-

।গত ৩৫ বছরে দেশে এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী)তে খরচ হয়েছে ২,২২,৯৯২ (দুই লক্ষ বাইশ হাজার নয়শত বিরানব্বই)।

কোটি টাকাএ উন্নয়ন বাজেটের ২৫% কাজে লাগছে আর ৭৫% লুটপাট হয়েছে বলে ইত্তেফাক প্রত্রিকার রির্পোট৪৪ বছরে
এডিপি ৫,০৭,০৪৮(পাঁচ লক্ষ সাত হাজার আটচল্লিশ) কোটি টাকা

।ম্যানিফেস্টো নির্বাচন উপলক্ষে জনগণের বিবেচনার জন্য:।

''জনগণকে ঘোষণা দিতে হবে যে, দেশ যতদিন অর্থৈনতিকভাবে উন্নত ও আত্মনির্ভর না হচ্চে এবং সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানুষের বসবাসের উপযোগী বাসাবাড়ি, আধুণিক চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি না হচ্চে ততদিন সরকারকে ভোগবিলাসে সম্পদের অপচয় নিষিদ্ধ রাখতে হবে। জনগণের অপরিহার্যেভাগের চাহিদা পূরণ করার পর দেশে উৎপাদিত সম্পদ, প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা ও বিদেশী সাহায্য দিয়ে শক্তিশালী অর্থৈনতিক ও সামাজিক অবকাঠামো, প্রচুর শিল্প-কারখানা ও উন্লত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশের বাজার ভারতীয় পণ্য ও অন্যান্য বিদেশী পণ্য থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এ ঘোষণার ব্‌াস্তবায়ন ছাড়া কোন দল সরকারী ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। ক্ষমতাপ্রত্যাশী প্রতিটি দলকে এ ঘোষণা দিতে হবে। ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে এটাই হবে জনগণের নির্বাচনী ঘোষণা বা ম্যানিফেস্টো।"

আমাদের দেশের জনগণ আজকে ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন। বেকারত্ত্ব, দারিদ্র, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, আয়ের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ-পত্রের অতিরিক্ত দাম, ক্ষমতা ও ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে হানাহানি, সন্ত্রাস, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, দুনীর্তি, চাঁদাবাজি, খুন-চুরি ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি-বিদেশে শিশু ও নারী পাচার, নারী ও শিশু নির্যাতন ইত্যাদি বাংলাদেশের নিত্যদিনের ব্যাপার। সব দেশের মানুষের কাছে নিজের দেশ খুবই প্রিয়। মানুষ নিজের দেশে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতি পরিবেশের মধ্যে থাকতেই ভালবাসে। কিন্তু, আজকের বাংলাদেশ যেন বসবাসের অনুপযুক্ত। জনগণ দিশেহারা। মানুষের কাছে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলেই মনে হয়। ফলে তরুণরা বিদেশে পাড়ি দিতেই আগ্রহী। তারা মনে করে বিদেশে যেতে পারলেই তাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হয়ে উঠবে। কিন্তু, একটা দেশের সব মানুষত আর বিদেশে যেতে পারে না। জনগণের একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ বিদেশে গিয়ে নিজেদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরী করতে পারে। বাদবাকী আপামর জনগণের ভবিষ্যৎ দেশের ভবিষ্যতের উপর নির্ভর করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই আপামর জনগণ দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এম.পি., রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী ও দেশের কোটিপতি ধনীসহ যাদের বিদেশে বিষয়-সম্পত্তি আছে অথবা বিদেশী ব্যাংকে বিশাল অংকের টাকা জমা আছে, বিদেশে ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা ও বসবাস করে তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন চিন্তা নেই। অবস্থা বেগতিক দেখলে তারা যখন ইচ্ছা তখন বিদেশে পাড়ি দিতে পারে। আমাদের দেশ যদি উন্নত হয় তা'হলে বিদেশে না গিয়েও এদেশেই সবার জন্য মোটামোটি একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভভব। কীভাবে এদেশকে উন্নত করা যায় অথবা আদৌ এদেশকে উন্নত করা সম্ভব কিনা সেটাই প্রশ্ন। এ প্রশের উত্তর এদেশের মানুষ জানে না। তাই মানুষ দিশেহারা।

আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আর বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, এরকম মনে করা ভুল। আমরা আজকে যে সংকটের সম্মুখীন পৃথিবীর অনেক দেশ তার চেয়েও বড় সংকট ও দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। জাপান ও জার্মানীর কথাই ধরা যাক। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) এ দুইটি দেশ ধবংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। দিনরাত ইংরেজ ও আমেরিকানদের বোমাবর্ষেণর ফলে জার্মানীর সব শহরই মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। শহরের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো(যেমন-সমুদ্র বন্দর, নদী বন্দর, বিমান-বন্দর, রেলপথ, সড়ক, সেতু, বাঁধ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদি) ও সব ধরণের শিল্প-কারখানা ধবংস হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকানরা এ্যাটম বোমা মেরে জাপানের দুইটি শহরকে একেবারে নিশ্চিহ করে দিয়েছিল। জাপানের রাজধানী টোকিওতে আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলা হয়েছিল। যুন্ধের পর এ দুই দেশ কর্মক্ষম মানুষ, বিশেষ করে কর্মক্ষম পুরুষ মানুষের তীব্র অভাব দেখা দেয়। যুদ্ধে এ দুই দেশের কোটি কোটি মানুষ মারা যায় অথবা পুঙ্গ হয়ে পড়ে। অথচ, যুদ্ধের পর মাত্র দশ বছরের মধ্যে এ দুই দেশ যুদ্ধে ভয়াবহ ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে উঠে আক্ষরিক অর্থেই ধবংসস্তুপের নীচ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল। আজকের বিশ্ব অর্থনীতিতে আমেরিকার পরেই জাপান ও জার্মনীর স্থান। আজ থেকে অর্ধ শতাব্দী আগে জাপান ও জার্মানীর পক্ষে যা সম্ভব হয়েছে। আমাদের পক্ষে একবিংশ শতাব্দীতে তা কেন সম্ভব হবে না। আজকে পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। এ সুযোগটা আমরা যদি কাজে লাগাই তা'হলে আমাদের এদেশকেও গড়ে তোলা সম্ভব। এক সময় এদেশের মানুষ দেশী-বিদেশী স্বার্থােনষী গোষ্ঠীর এ প্রচারে বিশ্বাস করতো যে আমরা যেহেতু দরিদ্র তাই অমাদের দরিদ্রই থাকতে হবে। কিন্তু এখন সবাই একবাক্যে স্বীকার করে যে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দরকার সঠিক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক কর্মপন্হা।

আমরা আজকে যেসব সমস্যার সম্মুখীন বলে উপরে উল্লেখ করা হয়েছে সেসব সমস্যা বর্তমান সমাজ ও অর্থনীতির সৃষ্টি। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির বৈশিষ্ট হলো পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতা। এদেশের সরকার আমেরিকা, জাপান, বৃটেন প্রভৃতি উন্নত দেশের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা ও পরনির্ভরতার সুযোগ নিয়ে এসব "দাতা দেশ" নিজেদের ও ভারতের অর্থনীতির স্বার্থে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ভারতের বিশাল ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির সাথে আমেরিকা, জাপান, বৃটেন প্রভৃতি দেশের স্বার্থ গভীরভাবে জড়িত। তাই দাতা দেশগুলির উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে অনুন্নত ও দরিদ্র রেখে ভারতকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদসহ সব রকমের সুবিধা দেওয়া। এটা এখন আর দেশবাসীর অজানা নয় যে, আমেরিকা ও ভারত আমাদের অতি মূল্যবান গ্যাস সম্পদ ভারতে রপ্তানি করার জন্য বাংলাদেশের সরকার ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থৈনতিকভাবে দুর্বল ও পরনির্ভর কোন দেশের সরকারের পক্ষেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভরশীল আজকের বাংলাদেশ সরকার এর ব্যতিক্রম নয়। অথচ, আমরা নিজেরা আমাদের গ্যাস ব্যবহার করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থৈনতিকভাবে উন্নত হতে পারি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি, শিল্প ও কৃষিতে গ্যাস ব্যবহার করে আমরা আমাদের অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে উঠতে পারি। অবশ্য এজন্য বিশাল আকারে সম্পদ বিনিয়োগ করে আমরা আমাদের অর্থৈনতিক পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে উঠতে পারি। অবশ্য এজন্য বিশাল আকারে সম্পদ বিনিয়োগ করা দরকার। বিদেশীরাও যদি নিজেদের মুনাফার স্বার্থেই গ্যাস দিয়ে এখানকার অবকাঠামো, শিল্প ও কৃষির উন্নতির জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ করত তা'হলে আমরা গ্যাস রপ্তানি করার চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হইব। কিন্তু, আমেরিকা ও ভারতের উদ্দেশ্য হলো ভারতে গ্যাস রপ্তানি করে দ্রুত মুনাফা অর্জন। তাতে বাংলাদেশ গরিব থাকলে তাদের যায় আসে না। ভারত উন্নত হলে আমেরিকা, জাপান ও বৃটেনের মত ধনী দেশগুলির ব্যবসা-বাণিজ্য কয়েকগুন বৃদ্ধি পাবে। তাই আমেরিকা, ভারত ও এখানকার স্বার্থােন্বষী মহলের যুক্তি হলো, বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ। গ্যাস ব্যবহার করার জন্য যে সম্পদ বিনিয়োগ করা দরকার সেই সম্পদ বাংলাদেশের নেই। তাই গ্যাস মাটির নীচে ফেলে না রেখে ভারতে রপ্তানি করলে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে। এটা হলো সেই যুক্তি যেটা শোষক মহাজন গরিব কৃষকের জমি গ্রাস করার জন্য দিয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে গ্যাস রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে সেটা দেশে থাকবে না। বিদেশী কোম্পানী সেই অর্থ বিদেশে পাচার করবে। আর দেশের দুর্নীিতপরায়ন শাসকরা বিদেশী ব্যাংকে নিজেদের একাউন্টে জমা রাকবে। নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে তাই হয়েছে। এদেশের শাসকরা পৃথিবীর অন্যতম দুর্নীিতবাজ বলে পরিচিত। ফলে, একদিন যখন মাটির নীচে গ্যাস শেষ হয়ে যাবে তখন আমাদের অর্থৈনতিক উন্নয়নের সব সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যাবে। আমরা তখন খালি থলে ধরে রাখব। অতএব, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে আমাদের গ্যাস ভারতে রপ্তানি না করে অবিলম্বে বিদ্যুৎ ও শক্তি (পাওয়ার), শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু, এজন্য যে সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে সেটা কোথা থেকে আসবে? আমেরিকা বা দাতা দেশগুলির স্বার্থে কাজ না করলে তারা নিশ্চয় আমাদের সাহায্য করবে না। অতএব, বিদেশী সাহায্য নিয়ে দেশের অর্থৈনতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থৈনতিক উন্নয়নের পথ হলো আত্মনির্ভরতা। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে দেশকে অর্থৈনতিকভাবে উন্নত করতে হবে। অবশ্য ইউরোপ ও আমেরিকা যুগ যুগ ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে ধনসম্পদ লুট করে নিয়ে নিজেদের দেশকে উন্নত করেছে। আমাদের জন্য সে পথ বন্ধ। তাই বাংলাদেশের অর্থৈনতিক উন্নয়নের জন্য আত্মনির্ভরতাই একমাত্র পথ।

অর্থৈনতিক উন্নয়নের মূল কথা হলো, প্রথমতঃ শক্তিশালী অর্থৈনতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা। বিদ্যুৎ শক্তি (পাওয়ার), আধুণিক প্রযুক্তি, সর্বপ্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিস্কাশন, নদী শাসন, সেচ, পানি সম্পদ, মাটির উর্বরতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ইত্যাদি অর্থৈনতিক অবকাঠামোর অন্তর্ভূক্ত। দ্বিতীয়তঃ সামাজিক অবকাঠামোর উন্লয়ন, অর্থাৎ শ্রমিক-কৃষক-মজুরসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন (পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশে মানুষের বসবাসের উপযোগী বাসাবাড়ি, আধুণিক চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইত্যাদি)। দেশবাশীর স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষার মান এবং সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন ছাড়া কোন দেশ আজকের যুগে উন্নত হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর মুখে অহরহ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার কথা শোনা যায়। কিন্তু, নড়বড়ে অর্থৈনতিক ও সামাজিক অবকাঠামো নিয়ে পৃথিবীর কোন দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখে এ ধরণের বাগাড়ম্বরই। এসব কথাবার্তা সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বলা হয়। অর্থৈনতিক উয়নের লক্ষ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশে মজবুত অবকাঠামো, প্রচুর শিল্পকারখানা ও উন্নত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসবের জন্যেই বিশাল আকারে সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের মত একটি গরিব দেশে সেই সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের মত একটি গরিব দেশ সেই সম্পদ কীভাবে সংগ্রহ করবে? একটা বিষয় লক্ষ্য করলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

দেশ যখন অর্থৈনতিকভাবে পশ্চাৎপদ এবং দেশের আপামর জনগণ যখন দরিদ্র তখন আমরা লক্ষ্য না করে পারিনা যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এম.পি., ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রী ও দেশের কোটিপতি ধনীরা প্রাইভেট-কার, এয়ার-কন্ডিশনার, প্রাসাদের মত বাসাবাডি, ঘর সাজাবার দামী সরঞ্জাম, চোখ ধাধানো আনন্দ উৎসব, বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, বিদেশে বসবাস ও বিষয়-সম্পত্তি ক্রয় ইত্যাদি নিয়ে অশল্পনীয়ভাবে বিলাসী জীবন-যাপন করছে। এসব ভোগবিলাসে দেশে উৎপাদিত সম্পদ, প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা ও বিদেশী সাহায্য অপচয় ও বিদেশে পাচার হচেছ। এভাবে এক শ্রেণীর মানুষের ভোগবিলাসে যে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ অপচয় ও বিদেশে পাচার হচেছ সেই সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থৈনতিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে বিনিয়োগ করার জন্যে সম্পদের অভাব হবে না। সরকারী ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ, আমলা ও তাদের সাথে যুক্ত ধনী ব্যক্তিরা বিভিন্ন পথে বিশেষ করে দেশের জনগণকে শোষন ও বঞ্চিত করে এবং দুর্নীিতর আশ্রয় নিয়ে যে বিশাল ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে থাকে সেটা ভোগবিলাসে অপচয় ও বিদেশে পাচার হয়। সম্প্রতি ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নামক একটি সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্নীিতর কারণে ২০০০ সালের প্রথম ৬ মাসে সরকারের ১১ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ক্ষতি সরকারের নয়, জনগণের হয়েছে। এদেশে বড় আকারের দুর্নীিতর সাথে সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু কওে মন্ত্রী, আমলা, এম.পি. ও দেশের বড় ধনীরা জড়িত থাকে। এ দুর্নীিতবাজরা দেশের উৎপাদিত সম্পদ, প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা ও বিদেশী সাহায্য আত্মসাৎ করে। এদের দুর্নীিত প্রমাণ করা কঠিন। দুর্নীিতবাজ ব্যক্তিরা এতই ক্ষমতাধর যে, তাদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও অসম্ভব। তাছাড়া প্রশাসনের সর্ব স্তরেই ব্যাপক দুর্নীিত লক্ষ্য করা যায়।(এদেশে ছোট আকারের দুর্নীিতও আছে। যেমন, ভোট বিক্রি, অফিস-আদালতে ছোট কর্মচারীদের ঘুষ-দুর্নীিত ইত্যাদি। বাঁচার তাগিদে এই দুর্নীিত। কারণ সৎভাবে বাঁচার পথ বন্ধ। যখন মানুষ সৎভাবে বাঁচার সুযোগ পাবে তখন ছোট আকারের দুর্নীিত থাকবে না।) বড় দুর্নীিতবাজরা আদালতে হাজির না হলেও ছোট 'দুর্নীিতবাজদের' ঠিকই আদালতের কাঠ গড়ায় দাঁড়াতে হয়। এ অবস্থায় দুর্নীিতর বিরুদ্ধে একমাত্র কার্যকর ব্যবস্থা হলো ভোগবিলাস ও বিদেশে সম্পদ পাচার বন্ধ করা। তাহলেই দর্নীিতলব্ধ অর্থ ভোগ করার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে দুর্নীিত করার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে। যে টাকা ভোগে আসে না সে টাকার কোন দাম নেই। তবে বিষয়টা শুধু দুর্নীিতলব্ধ সম্পদের ভোগবিলাসে অপচয় ও পাচার করা বা না করা নয়। দেশের বর্তমান অবস্থায় সম্পদের সকল ধরণের অপচয় ও বিদেশে পাচার বন্ধ করতে হবে। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল কারণ ছিল, বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের) সম্পদ পাকিস্তানে পাচার। আজও যদি সম্পদ বিদেশেই পাচার হয় তা'হলে স্বাধীনতার কী অর্থ? আর যারা দেশের সম্পদ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিদেশে পাচার করে তাদের সাথে তখনকার শাসক পাকিস্তানীদের কী পার্থক্য? বিদেশে তৈরী বিভিন্ন বিলাস সামগ্রী যেমন, প্রাইভেট-কার, এয়ার-কন্ডিশনার, ঘর সাজানোর বিভিন্ন সরঞ্জাম, বিদেশী সিগারেট, মদ, বিদেশী দামী পোশাক ও প্রসাধনী ইত্যাদি আমদানি বা ভোগ পরোক্ষ সম্পদ পাচার। আর যখন বাংলাদেশী টাকাকে ডলার-পাউন্ডে পরিণত করে বিদেশে পাঠানো হয় তখন সেটা প্রত্যক্ষ পাচার। এ ধরনের সম্পদ পাচারের কিছু খবরাখবর সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। সরকার সমর্থক একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, প্রধানমন্ত্রীসহ ১৫(পনর) জন মন্ত্রী, বর্তমান সংসদের সরকার ও বিরেধীদলের ৫৫ জন এম.পি., প্রাক্তন মন্ত্রী ও এম.পি.দের সন্তানেরা আমেরিকায় পড়ালেখা ও বসবাস করে। তা'ছাড়া আরও অনেক ধনীব্যক্তির সন্তানেরা বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে পড়ালেখা করছে। আর একটি জনপ্রিয় সাপ্তাহিকে প্রকাশিত বিবিসি'র বাংলা বিভাগের এক প্রবীণ এদেশীয় সাংবাদিকের লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিগত ৫ বছরে বাংলাদেশের অন্ততঃ ১৪০ জন সরকার ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিক ও আমলা যুক্তরাষ্টের একমাত্র নিউইয়র্ক শহরেই বেশ কিছু বাড়ি কিনেছে। এদের একজন কিছুদিন আগে সরকারী প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে আমেরিকা গিয়ে বাড়ি কিনেছেন। সন্ত্রাস ও হরতালের কারণে দেশে পড়াশুনার পরিবেশ না থাকায় তার স্কুলগামী সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষার(?) জন্যই নাকি সেদেশে তার বাড়ি কেনার (ও সম্পদ পাচার করার) প্রয়োজন হয়েছে বলে ওই রাজনীতিকের ধারণা। খবর অনুযায়ী বর্তমান সরকারের একজন উদ্র্ধতন মন্ত্রী নাকি নগদ অর্থে (এক মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ পাঁচ কোটি টাকারও বেশি মূল্যে) ৩টি বাড়ি কিনেছেন নিউইয়র্কে। লন্ডনেও কিনেছেন বেশ কিছু মন্ত্রী, আমলা ও অন্যান্য ধনী ব্যক্তি। এদেশের এক ডাকসাইটে রাজনৈতিক পরিবারের এক কন্যা লন্ডেনের অত্যন্তঃ ব্যয়বহুল হ্যাম্পস্টেডের অভিজাত এলাকায় বিরাট এক বাড়ির মালিক হয়েছেন। তিনি সে দেশে চাকরি বা অন্য কিছু করেন বলে কারও জানা নেই। বিবিসি'র উক্ত সাংবাদিক ৪০ বছর লন্ডনে থেকে ভাল চাকরি করেও হ্যাম্পস্টেডের বিশেষ এলাকায় বাড়ি কেনার কথা ভাবতেও পারেননি বলে তার লেখায় উল্লেখ করেছেন। যখন আমাদের দেশ শিল্পোন্নত হয়ে উঠবে এবং দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নিয়মিত কাজ ও কাজের বিনিময়ে মানুষের মত বাঁচার আয়ের ব্যবস্থা হবে তখন বিলাস সামগ্রীর উপর কোনরুপ বিধি নিষেধ আরোপ করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু আজকের অবস্থায় ধনীদের বিলাসিতা মেনে নেওয়া যায় না। সম্প্রতি জাতিসঙ্গের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থৈনতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ) থেকে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের বার্ষিক মাথাপিছু আয়-৩(তিন) হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট-কার) ব্যবহার শুরু হয়। আর এদেশে মাথাপিছু আয় ৩০০(তিনশত) ডলারে উপনীত হওয়ার আগেই রাস্তায় প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যায়।